বজলুর রহমান থানাপাড়া দর্শনা চুয়াডাঙ্গা।
মোস্তাক আহমেদ। সংগীতশিল্পী হিসাবে আমরা যাকে বেশি জানি।আজ তার জন্মদিন।১৯৬২ সালের আজকের দিনে পৃথিবীতে আগমন। শৈশব থেকে একসাথে আমাদের বেড়ে ওঠা। দর্শনার এক পাড়াতে বাড়ি আমাদের। স্কুল জীবন শুরু হয় একই স্কুলে।প্রথম স্কুল পূর্ব রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কলেজ পাড়া, দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা।এরপর মাধ্যমিকের পাঠ শুরু কেরুজ হাই স্কুলে।
পোশাকে কেতাদূরস্ত পরিপাটি চেহারার বন্ধুটির জীবন খানিকটা ছন্দহীন,অগোছালো, যদিও ছন্দের সাথে সব সময় ওঠাবসা। শিল্পীদের যেমন হয়ে থাকে আর কি!কেরুজ হাইস্কুলে পড়তে পড়তে মনে হলো অন্য স্কুলে একটু পড়ে দেখি! যেমন ভাবা তেমন কাজ। স্কুল পরিত্যাগ করে দর্শনার আর এক শতাব্দী প্রাচীন মেমনগর বিপ্রদাস উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেল।
আমারা একসাথে এস এস সি পরীক্ষা তে বসলাম ১৯৮০সালে। যদিও মোস্তাক আমাদের থেকে উপরের ক্লাসে পড়ত। এসএসসি তে এসে এক হলাম। যাই হোক এসএসসি পাশ করলাম একসাথে। ভর্তি হলাম দর্শনা ডিগ্রী কলেজে। পরবর্তীতে ১লা মে ১৯৮৩ সালে এই কলেজের সরকারিকরণ হয়। নাম হয় দর্শনা সরকারি কলেজ।
এখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে শিল্পী মোস্তাক আহমেদ। তবে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পূর্বেই ভর্তি হয় বুলবুল ললিতকলা একাডেমী ঢাকাতে। এরও পূর্বে চাচা প্রখ্যাত নজরুল সংগীত শিল্পী ওস্তাদ সোহরাব হোসেনের অনুপ্রেরণায় ভর্তি হয় ঢাকা মিউজিক কলেজে। সেখানেই তার আনুষ্ঠানিকভাবে নজরুল সঙ্গীত এবং উচ্চাঙ্গ সংগীতের হাতে খড়ি।
ছোট থেকেই সংগীতের প্রতি অতিমাত্রায় ঝোঁক ছিল। বড় ভাই শামসুল আলম ছিলেন সঙ্গীত শিল্পী। বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় ভর্তি হয়েছিল দর্শনার প্রাচীন সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিন্দোল সংগীত পরিষদে। যদিও বাবা ওয়াজেদ উদ্দিন ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ।
কোন কোন ক্ষেত্রে কিছুটা কট্টর তবে ইসলামী সঙ্গীতের ক্ষেত্রে ছিলেন খানিকটা খোলা মনের মানুষ। একদিন বাড়ির বৈঠক খানাতে মোস্তাকের কন্ঠে ইসলামী নজরুল গীতি শোনার পর মনটি নরম হয় তাঁর। পরবর্তীতে এই ধর্মপ্রাণ বাবা নিজ হাতে টাকা দিয়েছিলেন নতুন একটি হারমোনিয়াম কেনার জন্য। ওয়াজেদ উদ্দিনের ছোট দুই ভাই ওস্তাদ সোহরাব হোসেন, ওস্তাদ এম এ মান্নান এদেশের স্বনামধন্য ইসলামিক সংগীতশিল্পী। তবে তিনি পছন্দ করতেন ওস্তাদ ফজলুল হকের ইসলামী সংগীত।
এভাবেই চলছিল,একসময় খুলনা বেতারে নজরুল সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে তালিকাভুক্ত হয় আমাদের মোস্তাক আহমেদ।বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন উচ্চ শ্রেণীর তালিকাভুক্ত নজরুল সংগীত শিল্পী মোস্তাক আহমেদ।
স্কুল,কলেজে পড়ার সময় মোস্তাকের কন্ঠ যাদুতে মোহিত হয়নি এমন শ্রোতা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। স্টেজে মোস্তাক যখন হারমোনিয়ামের সামনে দাঁড়াই সামনে বসা শ্রোতা বন্ধুরা কেমন যেন মোহিত হয়ে পড়ে। মোস্তাকের সংগীত ধরা বা শুরু, প্রক্ষেপণ, হারমোনিয়ামে হাত রাখা,তানপুরাতে মনসংযোগ সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের নাটকীয়তা। এভাবেই শ্রোতা সাধারণের মন জয় করতে সে ছিল সিদ্ধ হস্ত, পাকা জহুরি। তাকে তবলায় সংগত করত বাবু সুরেন কুমার দাস। দুজন যুগোল বন্দি ছিল দেখার মত। সুরেন আজ আমাদের মাঝে নেই। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা!
স্কুল কলেজের সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় তার জন্য চার থেকে পাঁচটা প্রথম পুরস্কার নির্ধারিত থাকতো! কেউ সেখানে ভাগ বসাতে পারতো না। এক সময় দর্শনা কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত নাট্য সম্পাদক ছিল আমাদের মোস্তাক। দর্শনা কলেজ ছাত্র সংসদের সংগীত ভবনে আমরা আমাদের শিক্ষা জীবনের অনেক সময় পার করেছি। এই আড্ডাতে বেশ কিছু সংগীত জন্মগ্রহণ করে।
বিশেষ করে নবীন বরণে নবীনদের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়,"এসোহে নবীন, বরণ করি"! এই গানের রচয়িতা কানাডা প্রবাসী বন্ধু তৎকালীন ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক প্রকৌশলী মুশফিকুর রহমান জিন্টু। সুরকার মোস্তাক আহমেদ।কম্পোজার বিশিষ্ট কথক নৃত্যশিল্পী সাজু আহমেদ, প্রয়াত মোস্তাফিজুর রহমান।
এভাবেই চলছিল!এক সময় হঠাৎ জিন্টু হারিয়ে যায়। তাকে
যখন খুঁজে পেলাম তখন সে বাংলাদেশ প্রকৌশল
বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র পরিবর্তিত নামে মাহমুদুর
রহমান জিন্টু। এই নাটকীয় চরিত্রের বন্ধু জিন্টুকে নিয়ে আমার
একটা লেখা আছে। আমার টাইমলাইনে পাওয়া যাবে।
জিন্টুর অনুপস্থিতিতে আমি কলম ধরতে চেষ্টা করেছিলাম।
সে সময় স্বৈরাচার বিরোধী সংগীত, বেশ কিছু দেশ সঙ্গীত
সৃষ্টি হয়েছিল দর্শনা কলেজের ঐ সংগীত ভবন থেকে। ছাত্র
সংসদ ভবনের পাশেই ছিল ছোট্ট একটি কক্ষ,যেখানে সংগীত
চর্চা হত।তাকেই আমরা সে সময় "সংগীত ভবন" নাম
দিয়েছিলাম।
উল্লেখ্য সেই সময়ের সৃষ্টি আমার একটি দেশ গান গতবছর
সঙ্গীত শিল্পী শহীদ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে পরিবেশন
করে সেখান থেকে পুরস্কৃত হয়েছিল। সুরকার হিসেবে
মোস্তাক আহমেদ এবং গীতিকার হিসেবে আমাকে চুয়াডাঙ্গা
জেলা শিল্পকলা একাডেমি স্বীকৃতি দিয়েছিল।এও এক
ধরনের ভালোলাগা।
সেই সময়ে এ সকল কর্মকান্ডে যার সর্বাত্মক সহযোগিতা
পেয়েছিলাম তিনি হচ্ছেন দর্শনা কলেজ ছাত্র সংসদের
তৎকালীন ভিপি বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারুল ইসলাম।
আমাদের নেতা বাবু ভাই।
যাইহোক ছিলাম মোস্তাক আহমেদে, সেখানে ফিরে আসি।
১৯৮৬ সাল। সদ্য সরকারি কলেজ দর্শনা। সকলে ভালো
ভাবে পরীক্ষা দিয়ে স্নাতক পাস করে গেল। সে সুযোগ নিতে
পারেনি আমাদের মোস্তাক।
পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে স্নাতক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে
মোস্তাক আহমেদ। ঠিক পরীক্ষার আগ মুহূর্তে মোস্তাক নেই,
নেই তো নেই। মাস দুই পর খবর পাওয়া গেল মোস্তাক এখন
ভারতের বর্ধমানে। সেখানে কাজী নজরুলের চুরুলিয়ার
গ্রামের বাড়িতে সংগীত নিয়ে ব্যস্ত সে। মাঝে একদিন প্রখ্যাত
সংগীত শিল্পী শ্রদ্ধেয় মান্নাদের পদধলি নিয়ে আশীর্বাদ পুষ্ট
হয়েছে।
আমরা যারা মোস্তাকের কণ্ঠ শুনেছি তারা নিশ্চয়ই জানি
নজরুল সঙ্গীতের পাশাপাশি তার কন্ঠে মান্না দে দারুন ভাবে
আসন নিয়ে আছে।
এখনো যখন মোস্তাকের কন্ঠে শুনি, "ও কেন এত সুন্দরী হল,
আমি তো দেখে মুগ্ধ হবই"! মনে হয় স্বয়ং মান্না দে যেন তাঁর
সুর সুধা ঢেলে দিচ্ছে তার শ্রোতাদের জন্য!
যাইহোক মোস্তাক যখন ভারত থেকে ফিরে এলো ততদিনে
কলেজের স্নাতক ফাইনাল সম্পন্ন হয়ে গেছে। সুতরাং,
পরীক্ষা দেওয়া হলো না। ইতোমধ্যে মোস্তাক
তথ্যমন্ত্রণালয়ের অধীনে জেষ্ঠ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সরকারি
চাকরি প্রাপ্ত হয়েছে। বেশ ভালোই চলছিল। কেয়া
আহমেদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হল। ঢাকাতে সংসারী
হয়ে সংগীতের সাথে ওঠাবসা শুরু।
সংসারে পরপর দুই পুত্র সন্তানের আবির্ভাব ঘটল। ছেলেরা
বড় হয়ে উঠলো। লেখাপড়া শুরু করলো। সুখের মুখ একটু
একটু করে দেখা শুরু করল।
এমন সময় কেয়ার শরীরে বাসা বেঁধে থাকা ক্যান্সার জাগ্রত
হয়ে উঠলো। মোস্তাক সহধর্মিনী কেয়া আহাম্মেদ ক্যান্সারের
কাছে হেরে গেল।এই ঘটনার পর মোস্তাক আহমেদ নিজেও
কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে ফেলল।
উল্লেখ্য তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে
বেসরকারি সংগীত প্রতিষ্ঠান "নৈনামিকে" কিছুদিন নিজেকে
নিয়োজিত রেখেছিল। এরপর স্ত্রী বিয়োগের কঠিন সময় বড়ই
একাকী বোধ করতে লাগলো! তখন ঢাকার বাস চুকিয়ে
আবার দর্শনায় ফিরে এল।
বর্তমানে তার নিজ বিদ্যালয় মেমনগর বিপ্রদাস উচ্চ
বিদ্যালয়ের সংগীত শিক্ষক হিসাবে নিজেকে নিয়োজিত
রেখেছে, পাশাপাশি দর্শনা বালিকা বিদ্যালয় ছাত্রীদের
সংগীতের পাঠ দিয়ে চলেছে।
এছাড়াও দর্শনাতে "আনন্দধাম" নামে এক সঙ্গিত বিদ্যালয়ের
প্রধান হিসাবে সংগীতের সাথেই আছে।
আজকের দিনে শুভেচ্ছা ও শুভকামনা বন্ধু মোস্তাক
আহমেদ। তোমার সুললিত কন্ঠে অনুরনিত হোক সুমধুর সুর
প্রতিনিয়ত!!!
**************************
১৭ অক্টোবর,২০২৪! সোমবার।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ইয়াসির আরাফাত মিলন
স্বরস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ - প্রতিদিনের আলোচিত ক্ন্ঠ