প্রিন্ট এর তারিখঃ ফেব্রুয়ারী ২৫, ২০২৬, ১:০৯ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ ফেব্রুয়ারী ২৪, ২০২৬, ১২:২৯ পি.এম
নাজুক কোষাগার ও বাড়তে থাকা ঋণচাপ, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। একই সময়ে পরিচালন ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৫৮ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। ফলে ছয় মাসে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা, যা মূলত ঋণ নিয়ে মেটানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সীমিত সামর্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া এবং ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপের মধ্যে নতুন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করে। এর মধ্যে পরিচালন খাতে বরাদ্দ ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। প্রথম ছয় মাসে পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার ৪৬৩ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ৩১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা।
পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই গেছে সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, বেতন-ভাতা ও পেনশন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সহায়তায়। এ সময়ে সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৬৬ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা, ভর্তুকিতে ৩৭ হাজার ১৬৩ কোটি, বেতন-ভাতা ও পেনশনে ৪৭ হাজার ১২৫ কোটি এবং আর্থিক সহায়তায় ২৬ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা।
১৮ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের সময় নতুন সরকারের ওপর মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। নির্বাচনী ইশতাহারে পাঁচ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড এবং প্রকৃত কৃষকদের কৃষক কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও ঋণনির্ভরতা কমানোর কথাও বলা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৩টি উপজেলায় পাইলট ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে ২ হাজার টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে কৃষক কার্ড কর্মসূচিও দ্রুত চালুর প্রস্তুতি চলছে। ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানী ভাতা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
নীতিনির্ধারকরা বলছেন, ঋণনির্ভরতা কমিয়ে জনমুখী বাজেট প্রণয়ন করা হবে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, অতীতে নেওয়া ঋণের বড় অংশ উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়নি, ফলে ঋণের বোঝা বেড়েছে। বর্তমান সরকার ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণে কাজ করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ালে নতুন ব্যয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হবে। করের হার বাড়ালে তা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো এবং করজাল বিস্তারের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে, চলতি অর্থবছরে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৩০ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধ করতে হবে, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৩৭ কোটি। পরের অর্থবছরে এ পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এদিকে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার বকেয়া রয়েছে। জ্বালানি আমদানি, ভর্তুকি এবং বকেয়া পরিশোধের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শিল্প ও বিনিয়োগে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংশোধিত বাজেটে পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তা স্থগিত থাকলে সাময়িকভাবে অন্য খাতে ব্যবহার করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে বাড়তি অর্থসংস্থানের প্রয়োজন হবে।
অর্থ বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব মাহবুব আহমেদের মতে, কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকায় বাজেট বাস্তবায়ন ও প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকারকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতেই হবে। ঋণ নিয়ে চলমান ব্যয় বাড়ানো টেকসই সমাধান নয়।
সামগ্রিকভাবে সীমিত রাজস্ব, বাড়তে থাকা ঋণ ও জনমুখী প্রতিশ্রুতির চাপ—এই তিনের ভারসাম্য রক্ষা করাই নতুন সরকারের জন্য বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ইয়াসির আরাফাত মিলন
স্বরস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ - প্রতিদিনের আলোচিত ক্ন্ঠ