আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮০০টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি পরিচালনার জন্য প্রতি বছর প্রায় ১৫৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। ইরাকে এখনও চালু থাকা ঘাঁটিগুলো হিসাবের মধ্যে ধরলে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
মার্কিন অধ্যাপক ডেভিড ভাইন তাঁর গ্রন্থ Base Nation-এ বিশ্বব্যাপী মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বিস্তার, ব্যয় এবং এর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। রাশিয়ার বার্তা সংস্থা স্পুৎনিকের তথ্যেও বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির সংখ্যা ও ব্যয়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বের অধিকাংশ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রধান বিশ্বশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং জাপান ও জার্মানিতে শান্তিরক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরবর্তীতে কোরীয় যুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন জোরদার করে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করা হয়।
জাপান, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে এখনও বহু মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং সেখানে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পরও এসব ঘাঁটি বহাল রয়েছে এবং সেখানে সামরিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী এসব সামরিক ঘাঁটি পরিচালনার ব্যয় মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কাছ থেকে আদায় করা করের অর্থ থেকে বহন করা হয়। স্পুৎনিকের তথ্য অনুযায়ী বিদেশে মোতায়েন একজন মার্কিন সেনার জন্য করদাতাদের বছরে প্রায় ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় হয়।
বিদেশে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে। জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে একাধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ইরাক ও আফগানিস্তানেও মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, নির্বিচারে গুলি চালানো এবং বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতার অভিযোগ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থল, নৌ ও বিমানঘাঁটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিশ্লেষকদের মতে এসব ঘাঁটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন অঞ্চলে কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা এবং বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর বিভিন্ন দেশে নতুন করে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। বর্তমানে প্রায় ৮০টি দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটিতে প্রায় ৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি ভবন ও স্থাপনা রয়েছে এবং মোট প্রায় তিন কোটি একর জমি ব্যবহৃত হচ্ছে। সে হিসাবে পেন্টাগন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভূমির মালিক।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত দেশগুলোর মধ্যেও এখনও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। জার্মানিতে প্রায় ১৭২টি, ইতালিতে ১১৩টি এবং জাপানে ৮৪টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এছাড়া কোরীয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক দশক পরও দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ৮৩টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া, বুলগেরিয়া, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, সৌদি আরব, কাতার ও কেনিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
আঞ্চলিক মানচিত্র অনুযায়ী ইরানের আশপাশের বিভিন্ন দেশেও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ২০২১ সালের শেষ দিকে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগে ইরানের দুই পাশে অন্তত ১৯টি মার্কিন ঘাঁটি ছিল। মধ্য এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো বিবেচনায় নিলে ইরানকে ঘিরে থাকা মার্কিন ঘাঁটির সংখ্যা প্রায় ২৫টি বলে ধারণা করা হয়।
গ্লোবাল রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ১৫৬টি দেশে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন করে রেখেছে। প্রয়োজন হলে এসব সেনা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ফরেন সার্ভিসের কাতার শাখার সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড রিজিওনাল স্টাডিজের পরিচালক মেহরান কামরাভা উল্লেখ করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ইসরাইলের নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা করা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ইয়াসির আরাফাত মিলন
স্বরস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ - প্রতিদিনের আলোচিত ক্ন্ঠ