আমিরুল ইসলাম, শেরপুর প্রতিনিধি: শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের পশ্চিম সমশ্চুড়া এলাকার গহিন পাহাড়ে অভিনব কৌশলে সিসি ব্লক নির্মাণ কারখানা খুলেছেন স্থানীয় দুই ইউপি সদস্য। ওই কারখানা থেকে জেলাসহ নালিতাবাড়ী ও পাশ্ববর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলার বিভিন্নস্থানে এসব সিসি ব্লক বিক্রি করছেন তারা। এই কারখানায় পাশের পাহাড়ি রঞ্জনা ঝর্ণা থেকে অবৈধভাবে বালু, পাথর ও নুড়ি পাথর উত্তোলন করে এই কারখানায় তা ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বন ও প্রকৃতি। এমনকি পাশের শাল বনের টিলা ধ্বসে পড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার গারো পাহাড়ের গহিনে বন্যহাতির অভয়ারণ্য এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ওই সিসি ব্লক কারখানা। অবৈধভাবে পাহাড়ি ঝর্ণার বালু, নুড়ি ও সিঙ্গেল পাথর ব্যবহার করে এখানে তৈরি করা হয় এসব সিসি ব্লক।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের পশ্চিম সমশ্চুড়া গ্রামের সর্ব উত্তরে ভারতঘেঁষা অংশ কোনাবাড়ী বড়খোল নামক স্থানে ওই কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। গারো পাহাড়ের গহিনের এই অংশটি বন্যহাতির অবাধ বিচরণক্ষেত্র। ফলে গরু রাখাল আর লাকড়ি সংগ্রহ কারী মানুষের আনাগোনা খুব একটা নেই এখানে। এ কারণে স্থানটি বন্যপ্রাণী ও চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্য বললেই চলে। গত মাসের শুরুতে এই স্থানে থাকা রঞ্জনা র্ঝণা নামে পাহাড়ি ঝিরি থেকে উত্তোলিত বালু, নুড়ি আর সিঙ্গেল পাথর দিয়ে এখানে শত-শত সিসি ব্লক তৈরি করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের ইউপি সদস্য উমর ফারুক ও নবী হোসেন গহিন পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ ব্লক তৈরির কারখানা চালু করে দেদারসে বিভিন্ন এলাকায় এসব ব্লক বিক্রি করছেন।
অন্যদিকে, বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কারখানা সংলগ্ন এলাকায় বন বিভাগের লোকজনের যাতায়াত না থাকায় সেখানে পাহাড়ি ঝর্ণার বালু, নুড়ি ও সিঙ্গেল পাথর ব্যবহার করে সিসি ব্লক তৈরির বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বন কর্মকর্তারা জানান, উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভুমি) এর নির্দেশে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। এ সময় সিসি ব্লক তৈরির সব কার্যক্রম বন্ধ করার পাশাপাশি সিসি ব্লক তৈরির সব সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে।
এবিষয়ে বন বিভাগের মধুটিলা ফরেষ্ট রেঞ্জের বনবিট কর্মকর্তা কাউসার আহম্মেদ সাংবাদিকদের বলেন, কারখানাটি যে স্থানে স্থাপন করা হয়েছে সেখানে আমাদের লোকজনের খুব একটা যাতায়াত নেই। এ কারণে আগে বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত নই। তিনি আরো বলেন, তবে কয়েক দিন আগে এসি ল্যান্ড স্যারের নির্দেশে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। এ সময় সিসি ব্লক তৈরির সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিসি ব্লক তৈরির সব ধরনের সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে।
এব্যাপারে নালিতাবাড়ীর ইউএনও রেজওয়ানা আফরিন সাংবাদিকদের বলেন, আগে থেকে উত্তোলন করে রাখা বালু এবং পাথর দিয়ে নিজেদের জায়গায় তারা ব্লক তৈরি করছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। এটি আইনসিদ্ধ নাকি অবৈধ সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সিসি ব্লক তৈরিকারী ইউপি সদস্য উমর ফারুক সাংবাদিকদের জানান, নিজের পুকুরপাড়ে ব্লক বসিয়ে মেরামতের জন্য এসব সিসি ব্লক তৈরি করেছি। এখন এসব বেআইনি হলে তো কিছু করার নেই। যা হওয়ার হবে। পুকুরের পাড় মেরামতের জন্য এতো বেশি পরিমান ব্লক তৈরি করা হচ্ছে কেন নাকি এসব ব্যবসায়িক কাজের জন্য তৈরি করা হয়েছে ? এমন প্রশ্নের কোন সদোত্তর দিতে পারেননি তিনি।
সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত দুটি নদীর বালু মহালগুলো বন্ধ থাকায় স্থানীয়ভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহন সম্পুর্ণ নিষিদ্ধ রয়েছে। এর ফলে পাহাড়ের গহিনে থাকা রঞ্জনা ঝর্ণার বালু, নুড়ি ও সিঙ্গেল পাথর বিক্রি এবং পরিবহন করতে পারছে না উত্তোলনকারীরা। তবে ওই ঝর্ণার বালু, পাথর, নুড়ি পাথর কিংবা যে কোন ধরনের খণিজ সম্পদ উত্তোলণ করার সরকারীভাবে কোন প্রকার অনুমোদন নেই। তাই আইন অমান্য করে গহিন পাহাড়ে সিসি ব্লক তৈরি করে অভিনব কৌশলে বালু ও পাথর বিক্রির উপায় খুঁজে বের করেছেন স্থানীয় অসাধু ইউপি সদস্য নবী হোসেন ও উমর ফারুক। তারা জেলাসহ বিভিন্ন এলাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব তৈরিকৃত সিসি ব্লক বিক্রি করছেন। এবিষয়ে প্রশাসনের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানিয়েছে এলাকার সচেতন মহল।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ইয়াসির আরাফাত মিলন
স্বরস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ - প্রতিদিনের আলোচিত ক্ন্ঠ