আব্দুর রাজ্জাক বাবু, সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা হাটের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহ্যবাহী গাড়াদহ নদী এখন দখল ও দূষণের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময় নির্মল বাতাস ও স্বচ্ছ জলের জন্য পরিচিত এই নদী আজ আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
জানা যায়, সিরাজগঞ্জ জেলাকে বিভক্ত করে বয়ে চলা ফুলজোড় নদীর ভুইয়াগাঁতী এলাকা থেকে গাঢ়ুদহ নদীর উৎপত্তি। সেখান থেকে এটি চলনবিল অতিক্রম করে উল্লাপাড়ার লাহিড়ী মোহনপুরে গোহালা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। পরে গোহালা নদী শাহজাদপুর উপজেলার বুড়ি পোতাজিয়া এলাকায় বড়াল নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় গাড়াদহ ছিল একটি প্রবাহমান, প্রমত্তা নদী। বড় বড় নৌযান চলাচল করতো, আয়োজন হতো নৌকাবাইচ, আর মানুষ নৌকার মাধ্যমে পারাপার করত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীটি সংকুচিত হয়ে বর্তমানে সলঙ্গা হাট এলাকায় এসে প্রায় মৃত খালে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে। নদীর দুই তীর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট, বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা। কোথাও কোথাও পাইলিং করে বহুতল ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে নদীর নাব্যতা নষ্ট হয়ে এটি অনেকাংশে জলাশয় বা ডোবায় রূপ নিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সলঙ্গা বাজার এলাকার প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে নদীর জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। একইসঙ্গে হাট-বাজার ও আশপাশের বাসাবাড়ির সব ধরনের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে, যা পরিবেশ দূষণকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
ছালাম সরকার, সোহেল সেখ, রাকিব ও খোদেজা খাতুনসহ এলাকাবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাড়াদহ এক সময় বিশাল স্রোতস্বিনী নদী ছিল। বড় বড় মালবাহী নৌকা চলতো। বছরে বছরে নৌকা বাইচ হতো। নৌকা দিয়ে এপার-ওপার পারাপার হতো মানুষ। সেই যৌবনাবতী গাড়াদহ নদীটি সলঙ্গা হাটের কাছে এসেই মরা খালে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীরা নদীর পাড় দখল করে দোকানপাট-বাড়িঘর নির্মাণ করেছে। সেই সঙ্গে হাট-বাজারের যাবতীয় ময়লা আবর্জনা নদীর বুকেই ফেলা হচ্ছে। দখলমুক্ত ও পূণ:খনন না করায় নাব্যতা হারিয়ে জোলায় পরিণত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নদীটি।
স্থানীয়রা জানায়, নদীর দুই পার দখল করতে করতে এখন জোলায় পরিণত হয়ে গেছে। নদীর পার দিয়ে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে দুর্গন্ধে এখান দিয়ে মানুষের চলাচল দুস্কর হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সলঙ্গা বাজারের উত্তর-দক্ষিণে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর জায়গা অবৈধভাবে দখল করে দোকানপাট ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে। শাহজাহান আলী, আকবর আলী মাস্টার, আনোয়ার আমিন, বরুন সাহা, ফকরুল তালুকদার, তোতা তালুকদার, জুয়েল রানা, আজাদ, রবিন, আতাউর রহমান লাবু, ফণী ভুষন পোদ্দার, হিটু, আলীম মাইক, মৃত মনিরুজ্জামান তারা খোন্দকারসহ অর্ধ শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ ও ব্যবসা-বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের অনেকেই নদীর পাড়ে পাইলিং করে একতলা বা দোতলা ভবন নির্মাণ করেছেন। এদিকে সলঙ্গা হাট ও বাজারের যাবতীয় আবর্জনা ফেলে নদীর পানি ব্যাপকভাবে দূষিত করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাসবাড়ীর ময়লা-আবর্জনা, বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলার ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে নদীটিকে।
সলঙ্গা থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মারুফ হাসান খোকন বলেন, গাড়াদহ নদীর পারে কোন এক সময় কাউকে কাউকে লিজ দিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। পরবর্তীতে অনেকেই দখলে নিয়েছে। অনেকেই লিজ ছাড়াই নদীর পার দখল করে নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি না দেখে আমরা বলে কোন কাজ করতে পারবো না। আমরা সলঙ্গাকে দখলদারদের দৌরাত্ব থেকে মুক্ত হতে চাই।
দখলের কথা অস্বীকার করে আনোয়ার আমিনসহ অনেকেই বলেন, আমরা আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তির উপর ভবণ ও ঘর নির্মাণ করেছি। জমির সকল প্রকার বৈধ কাগজ রয়েছে। অনেকেই দাবি করেন, তারা লিজ নিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। তবে লিজের কোন প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
জনসাধারণের দাবী নদীতে কোন নিস্কাশনের পাইপ রাখা যাবে না। সিএস ম্যাপ অনুযায়ী খনন করে নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এটা যদি করা হয়, সরকার যদি আন্তরিকভাবে এই কাজটা করে সত্যিকার অর্থে আবার নদীমাতৃক দেশের যে প্রাণচাঞ্চল্য, স্নিগ্ধতা ও জীব বৈচিত্র ফিরে পাবো।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, আমাদের সরকার প্রতিশ্রুত ২০ হাজার কিলোমিটার ছোট নদী-খাল খননের প্রক্রিয়া রয়েছে। গাড়াদহ নদীটিও খননের পরিকল্পনা রয়েছে। নদীর বেশিরভাগ অংশই ঠিক আছে। সলঙ্গা বাজারটুকো দখলমুক্ত করতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ইয়াসির আরাফাত মিলন
স্বরস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ - প্রতিদিনের আলোচিত ক্ন্ঠ