মোঃ ফজলুল কবির গামা,,বিশেষ প্রতিনিধিঃ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি পুলিশ যে সাধারণ মানুষের পরম বন্ধু, তার এক অনন্য ও মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ঝিনাইদহ জেলার পুলিশ সুপার জনাব মোঃ মাহফুজ আফজাল। এক অসহায় ১২ বছরের শিশুর চোখের জল মুছে, তার পরিবারের একমাত্র জীবিকার উৎস চুরি হওয়া ইজিবাইকটি উদ্ধার করে সততা, দক্ষতা ও দ্রুততার এক উজ্জ্বল নজির সৃষ্টি করেছে ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ।
ঘটনার সূত্রপাত ঝিনাইদহ সদর থানার কাঞ্চনপুর গ্রামের জাকির হোসেনকে নিয়ে। নিম্নবিত্ত পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি জাকির হোসেন হঠাৎ ব্রেন স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে পড়লে পুরো পরিবারটি অথৈ সাগরে পড়ে। সংসারের হাল ধরতে এবং অসুস্থ বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমে আসে তার ১২ বছরের শিশু সন্তান সিয়াম।
কিন্তু গত ২৩ মে ২০২৬ তারিখ দুপুরে এক নির্মম ঘটনার শিকার হয় শিশুটি। কালীগঞ্জ থানাধীন জনতা মোড়ে তৃষ্ণা মেটাতে সিয়াম একটু পানি খেতে গেলে একটি প্রতারক চক্র তার চোখের পলকে ইজিবাইকটি নিয়ে পালিয়ে যায়। একমাত্র সম্বল হারিয়ে সিয়ামের রাস্তায় গড়াগড়ি খেয়ে কান্নার সেই হৃদয়বিদারক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে পড়ে। যা দেখে পুরো নেটিজেন দুনিয়া স্তব্ধ হয়ে যায়।
ভিডিওটি ঝিনাইদহ জেলার মানবিক পুলিশ সুপার মোঃ মাহফুজ আফজালের দৃষ্টিগোচর হওয়া মাত্রই তিনি নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) ইজিবাইকটি উদ্ধার এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্য কঠোর ও জোরালো নির্দেশ প্রদান করেন।
পুলিশ সুপারের সুনির্দষ্ট দিকনির্দেশনা ও তদারকিতে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ এক চৌকস অভিযান পরিচালনা করে। মাত্র দুই দিনের মধ্যে , ২৫ মে ২০২৬ ইং তারিখ রাতে যশোর জেলার চৌগাছা থানা এলাকা থেকে চুরি হওয়া ইজিবাইকটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। যদিও চোর চক্র ততক্ষণে ইজিবাইকটির ব্যাটারিগুলো খুলে নিয়ে গিয়েছিল।
পুলিশ সুপারের মানবিকতা এখানেই শেষ হয়নি। চোরেরা ব্যাটারি নিয়ে গেলেও সিয়ামের পরিবার যাতে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেজন্য পুলিশ সুপার জনাব মোঃ মাহফুজ আফজাল সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে ইজিবাইকটিতে সম্পূর্ণ নতুন ব্যাটারি সংযোজন করেন এবং অন্যান্য যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো সংস্কার করে দেন।
এরপর ২৭ মে ২০২৬ তারিখ সকাল ১১:০০ ঘটিকায় পুলিশ সুপার মহোদয় স্বশরীরে সিয়ামের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে সম্পূর্ণ সচল ইজিবাইকটি তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। এ সময় তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী ও পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক), ঝিনাইদহের সম্মানিত সভানেত্রী জনাব মোসফিকা মাহফুজ। পুনাক সভানেত্রী সিয়ামের অসহায় পরিবারটিকে পরম মমতায় ঈদ উপহার প্রদান করেন, যা পুরো এলাকায় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
পুলিশের এমন অবিশ্বাস্য দ্রুততা, আন্তরিকতা এবং মানবিক সহায়তা দেখে সিয়ামের পরিবার ও এলাকাবাসী কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, "আমরা ভাবতেও পারিনি এত দ্রুত ইজিবাইকটি উদ্ধার হবে, তাও আবার নতুন ব্যাটারি লাগিয়ে পুলিশ নিজেই বাড়িতে এসে দিয়ে যাবে! ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার ও তাঁর পুরো টিম আজ যে মহানুভবতা দেখালেন, তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।"
প্রতারক চক্রটিকে সনাক্ত করে সম্পূর্ণভাবে আইনের আওতায় আনার জন্য বর্তমানেও পুলিশের চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের এই জনবান্ধব ও মানবিক কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা বহুগুণ বেড়ে গেছে। সত্যিই, পুলিশ জনগণের বন্ধু—আজ তা আবারও প্রমাণিত হলো।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ইয়াসির আরাফাত মিলন
স্বরস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ - প্রতিদিনের আলোচিত ক্ন্ঠ