নিজস্ব প্রতিবেদক ভারত থেকে অবৈধভাবে লোকজনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার (পুশ ইন) অভিযোগকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বাড়ছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, গত বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অন্তত ১৩০ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থান ও নজরদারির কারণে এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের পশ্চিম, উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ১০টি সীমান্ত পয়েন্টে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে। বিজিবির দাবি, সেখানে বিএসএফ একটি প্রিজন ভ্যানে করে ৩০ থেকে ৩৫ জনকে এনে সীমান্তের গেট খুলে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। বিজিবি সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ তাদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
একই ধরনের ঘটনা যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত, জয়পুরহাটের কয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্ত এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তেও ঘটেছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৮ জনকে সীমান্তে আনার চেষ্টা করা হলে বিজিবি তাদের শূন্য রেখায় আটকে দেয়। নেত্রকোনার কচুগড়া সীমান্তেও পুশ ইনের প্রস্তুতির তথ্য পেয়ে বিজিবি সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, সীমান্তের শূন্য রেখায় অবস্থান করা ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। মানবিক কারণে স্থানীয়রা সহযোগিতা করতে চাইলেও আইনি জটিলতার কারণে তা সীমিত রয়েছে।
এদিকে আগামী ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, পুশ ইন, সীমান্ত হত্যা এবং নো-ম্যানস ল্যান্ডে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়গুলো সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে গুরুত্ব পাবে।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, পরিচয় যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে পাঠানোর চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতির পরিপন্থী। তারা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দুই দেশের সরকারের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্রুত কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রয়োজন। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, কোনো ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত না করে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করার চেষ্টা মানবাধিকারের পরিপন্থী।
ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর প্রধান কিরীটী রায়ও অতীতে গণমাধ্যমে বলেছেন, কোনো বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর সংশ্লিষ্ট দেশকে অবহিত করে ফেরত পাঠানোই আইনসম্মত পদ্ধতি।
সরকারও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি বলেন, কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি হলে পরিচয় যাচাইয়ের পর প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে, তবে জোরপূর্বক পুশ ইন গ্রহণযোগ্য নয়।
পুশ ইন প্রতিরোধে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি নজরদারি, টহল ও গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করেছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে এমন পরিস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিষয়টি দ্রুত কূটনৈতিক পর্যায়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ইয়াসির আরাফাত মিলন
স্বরস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ - প্রতিদিনের আলোচিত ক্ন্ঠ