নিজস্ব প্রতিবেদক স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তিন স্তরের নির্বাচন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন চলতি বছরও অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে বছরের শেষভাগে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সম্ভাব্য তফসিল জানা যেতে পারে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক অবস্থান যাচাইয়ের জন্য সরকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে একটি পরীক্ষামূলক ধাপ হিসেবে বিবেচনা করছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর এই নির্বাচন বর্তমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ এবং নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। তবে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোকে সরকার বা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায় থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ফলে নির্বাচনসংক্রান্ত প্রস্তুতিও আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সরকার বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে বা দাপ্তরিকভাবে কোনো নির্দেশনা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া মাত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো প্রস্তুতি শুরু করতে সক্ষম হবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. শহীদুল হাসান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে, সেটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয় পর্যায়ে এ বিষয়ে কোনো নীতিগত আলোচনা হয়নি। সরকারের নির্দেশনা পেলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এর আগে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম স্থানীয় সরকার নির্বাচন জুলাই-আগস্টের মধ্যে শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও কৌশল
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমান সরকার জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় এলেও তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হতে পারে। আওয়ামী লীগ সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও সরকারপন্থী জোটভুক্ত দলগুলোও নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে মাঠপর্যায়ে তৎপরতা বাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এসব রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় নিয়েই সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আপাতত পিছিয়ে রাখা হচ্ছে।
প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন
সরকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে আগ্রহী। সূত্র মতে, প্রথম ধাপে সরকারের জন্য তুলনামূলক অনুকূল ও নিরাপদ বিবেচিত কিছু এলাকায় ভোটগ্রহণ শুরু হতে পারে।
প্রথম ধাপের ফলাফল সন্তোষজনক হলে দ্রুত পরবর্তী ধাপের নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে। তবে ফলাফল প্রত্যাশিত না হলে পরবর্তী ধাপের নির্বাচন ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিধিমালা ও আচরণবিধি সংশোধন
নির্বাচন কমিশন বর্তমানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নির্দলীয় কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বিভিন্ন বিধিমালা ও আচরণবিধি সংশোধনের কাজ করছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্য পৃথক বিধিমালা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নির্দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আগামী ১৫ জুন খসড়া বিধিমালা ও আচরণবিধি নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে জনমত আহ্বান করা হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “১৫ জুনের মধ্যে খসড়া বিধিমালা ও আচরণবিধি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। ১৫ দিন জনমত গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে তা চূড়ান্ত করা হবে।”
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৫০০টি উপজেলা পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১টি জেলা পরিষদ এবং ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
ইসি ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ সহজ করতে একটি বিশেষ নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার প্রস্তুত করেছে। এতে নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ ও হালনাগাদের কাজ চলছে।
এ ছাড়া ভোটার তথ্য, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য প্রাথমিক প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। প্রয়োজনীয় বাজেট অনুমোদন এবং বিধিমালাসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এ খাতে চূড়ান্ত বরাদ্দ কত হবে, তা জানতে আগামী ৩০ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পাস হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ইয়াসির আরাফাত মিলন
স্বরস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ - প্রতিদিনের আলোচিত ক্ন্ঠ