দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক সময়ের আতঙ্কের নাম, চরমপন্থী নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান নান্টু@ লাল্টু গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাথরুমে পড়ে যেয়ে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা গেছে বলে পরিবারের দাবি। চুয়াডাঙ্গা আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা লাল্টু এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তার নামে রয়েছে খেলার মাঠ, স্থানীয় হাট বাজার প্রতিষ্ঠাতেও অবদান রেখেছেন তিনি।
এক জীবনে দুই রূপঃ
নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবন ছিল চরম বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে তিনি ছিলেন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন যোদ্ধা, অন্যদিকে স্বাধীনতার পর জড়িয়ে পড়েন আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার জগতে। নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হিসেবে তিনি নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
ভয়াবহ সেই ইটভাটার স্মৃতিঃ
আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গার সেই পুরনো ইটভাটা আজও স্থানীয়দের মনে শিহরণ জাগায়। অভিযোগ আছে, লাল্টুর নির্দেশে বহু মানুষকে হাত-পা বেঁধে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে সেই চুলায়। নিখোঁজ হওয়া অনেক মানুষের দেহাবশেষ সেখানে পাওয়া গেছে বলে এলাকায় লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, যা তাকে এক নৃশংস ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত করেছিল।
আত্মসমর্পণ ও কারাজীবনঃ
১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই তৎকালীন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি লুৎফুল কবীরের কাছে শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্রসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন লাল্টু ও তার বাহিনী। দীর্ঘ ১৯ বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালে তিনি মুক্তি পান। মজার ব্যাপার হলো, আত্মসমর্পণের সময় তিনি নিজের এলাকার উন্নয়নের জন্য ১৫ দফা দাবি পেশ করেছিলেন, যার মধ্যে বিদ্যুৎ ও রাস্তাঘাটের দাবিও ছিল।
ইতিহাসের দায়ঃ
এক সময়ের ‘মুকুটহীন সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত এই নেতার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা আজও বিচারাধীন। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি হয়তো অপরিচিত, কিন্তু চুয়াডাঙ্গার বাতাসে আজও তার সেই ভয়ংকর দিনগুলোর গল্প ভাসে। তার মৃত্যুতে যেমন একটি বিভীষিকাময় অধ্যায়ের ইতি ঘটল, তেমনি প্রশ্ন রয়ে গেল কীভাবে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি সহিংসতার প্রতীক হয়ে উঠলেন?
শান্তি ফিরুক স্বজন হারানো পরিবারগুলোর মনে। ইতিহাসের বিচার হয়তো এভাবেই অলিখিত থেকে যায়।
ছবিটি ২০১৮ সালের ০৭ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গা কোর্টে হাজিরা দিতে আসলে আমার নিজ হাতে তোলা। ইতোপূর্বে কুষ্টিয়া থেকে মেহেরপুর কোর্টে ২০১৩ সালে নিয়ে যাওয়ার সময় অনেক কথা হয়েছিল তার সাথে। খুব কাছ থেকে দেখা ও কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম দাম্ভিকতা/দাপুটে ভাব তখনো কমেনি, রাগান্বিত স্বরে আমাকে বলেছিল ‘খালি হাতে তোমার মত ৫/৭জন পুলিশ আমার কাছে কিছুই নাহ্’। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসহ চরমপন্থী দল গঠন করার অনেক গল্প হয়েছিল। চরমপন্থী দল গঠনের পেছনে অনেক কাহিনী শুনিয়েছিলেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সশস্ত্র যোদ্ধা হিসাবে এ সূর্য সন্তানের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ্ তাকে বেহেস্ত নসিব করুন।
কলমেঃ
রাজিবুল রাজ
উপ-পরিদর্শক (ডিবি)
চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ।।