সোমা রানী কর্মকার
আমি রাতের অন্ধকারে বসে আছি
আমার ভিলার বারান্দায়।
সামনে সুইমিং পুল।
পুলের নীল তলদেশ আর
পানির নীল রং ঝিলমিল করছে পুলের তলদেশের এলইডি বাতির আলোয়।
পুলের বাইরে সবুজ লনের পরে
দেয়াল ঘেঁষে নানান ফুলের গাছের ঝাড় ।
ঝাড়ের নিচে এলইডি বাতি।
সবুজ লনে চাঁদের আলোর মতো
নরম মায়া পুলের পানিতে ঝিলমিল করছে।
আমি হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
তখনই মনে হল আকাশ থেকে
যেন একটা তারা খসে পড়ল।
আগুনের ছড়া আমার ভিলায়
আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।
আমার ওপর আগুনের ছড়া পড়েছে।
সারা শরীরে আগুন ধরেছে।
আমার ডান হাত ছিটকে
পুলের পানিতে ভাসছে।
রক্তে পুলের নীল জলে লাল রেখা—
এক চিত্রকর যেন চিত্র আঁকছে।
আমার সারা শরীর আগুনে পুড়ছে।
আমি দিকবিদিক না দেখে পুলে ঝাঁপ দিলাম।
তখনই আমার ঘুম ভেঙে গেল।
আমার গলা শুকিয়ে গেছে।
ভয়ে কাঁপছি। আমি হুঁশে এসে
বুঝলাম এটা দুঃস্বপ্ন ছিল।
টিভিতে ইরান–ইসরাইলের যুদ্ধের
ক্লাস্টার মিসাইলের লাইভ দৃশ্য
দেখার কারণে এমন দুঃস্বপ্ন দেখা।
আমি আমার চারপাশ দেখলাম।
কি আনন্দে বেগুনভেলিয়া বাতাসে দুলছে।
পুলের নীল পানি তেমনি ঝিলমিল করছে।
চাঁদ-তারা সব তেমনি স্থির হয়ে আছে।
চারদিকের আঁধারে এলইডি আলো
সফেদ আলো বিলোচ্ছে।
সব ঠিক আছে—এটাই সত্যি ছিল।
তবে ইরানে বা ইসরাইলেও এটা স্বপ্ন নয়,
এটা নিরেট বাস্তব।
যখন তেহরানের কোনো পরিবার ডিনার
খেতে বসেছে আর তেলআবিবের পরিবার
ডিনারের রান্না করতে ব্যস্ত,
তখনই একই সময়ে দুই পরিবারের ওপর
বোমায় বিল্ডিংটাই ধ্বংসস্তূপের
ভিতরে ডুবে গেল।
এটা স্বপ্ন নয়, এটা সত্যি।
এ যুদ্ধের সাথে এই দুই পরিবারের
কোনো সম্পর্ক নেই।
এরা এটা শুরু করেনি।
এরা এদের পরিবার নিয়ে সুখে দিন কাটাত।
ছুটিতে বেড়াতে যেত।
রেস্টুরেন্টে খেতে যেত।
টিভিতে মুভি দেখত।
সকালে অফিসে যেত,
বিকেলে বাসায় ফিরত।
খেলার মাঠে খেলতে যেত ।
এরা তাদের নেতাদের নাম শুনেছে।
সামনাসামনি কখনো দেখেনি।
শুধু টিভিতে দেখেছে।
টিভিতে শুনল আমেরিকার সাথে
ইরানের যুদ্ধ বেঁধেছে।
এই ফ্যামিলির অকাল মৃত্যু
আরো অনেক মৃত্যুর মতোই
ধ্বংসস্তূপের ভিতর চাপা পড়ে আছে।
নেতারা সব বেঁচে আছে—
ইরানের এক বড় নেতা ছাড়া।
এই যুদ্ধ এক দেশকে আরেক দেশ
কি দেবে? আর অন্য দেশ কি হারাবে?
তার সাথে এসব পরিবারের
কোনো সম্পর্ক নেই।
তবু এদের ডিনার টেবিলে
ডিনার সামনে রেখে মরতে হয়।
আমি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ভিতরে
ছিলাম এগারো মাস।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরো চট্টগ্রাম শহরটা
পাকসেনারা ঘিরে রেখেছিল।
তার উপর আমার ছোট ভাই মুক্তিযুদ্ধে গেছে।
পাকসেনারা বিহারিদের সাথে নিয়ে
ঘরে ঘরে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজছে।
মৃত্যুভয়ে কেঁপেছি—
কখন আমার বাসায় রেইড হবে
আমার ভাইয়ের কারণে।
ভয়ে শেষের দিকে
শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলাম।
গ্রামেও কখনো কখনো পাকসেনা
আসছে শুনে আমার স্ত্রী আর
কোলের মেয়েকে
নিয়ে ধানক্ষেতে গিয়ে লুকাতাম।
পরে বুক পকেটে পাকিস্তানের ম্যাপ লাগিয়ে
শহরে আসতাম।
ব্যাংক থেকে টাকা তুলে
আবার দিনে দিনে গ্রামে চলে যেতাম।
শহরে এসে দেখি ইস্ট বেঙ্গল
রেজিমেন্টের হাতে অস্ত্র নেই।
এক ধরনের কালচে পোশাক,
মাথার চুল-ভুরু সব সেভ করা।
পুরোনো বুটজুতা।
দোকান থেকে চালের বস্তা
কাঁধে করে ট্রাকে তুলছে।
পাকসেনাটা বন্দুক হাতে
দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে।
মন দুঃখে কষ্টে ভরে গেল ।
পাক সেনাটাকে যদি একটা গুলি
করে মেরে ফেলতে পারতাম ।
তখনই শুনলাম আমার বোনের জামাই
গত রাতে পাক আর্মির রোড চেকপোস্টের
গার্ডের সাথে সামনাসামনি গোলাগুলি করতে
গিয়ে মারা গেছে ।
ও আর্মস নিয়ে বর্ডারের দিকে যাচ্ছিল।
ইনফরমেশন ছিল—
কোনো চেকপোস্ট নেই।
খবরটা ভুল ছিল।
দুই পক্ষের সবাই মারা গেছে।
আমার বোনের জামাই সহ
আটটা লাশ রাস্তায় পড়ে আছে।
আমি বহু কষ্টে ওকে দাফন করতে
ওদের গ্রামে গিয়েছিলাম।
আমরা দাফন করে চলে আসার পর
পাকসেনারা ওর বড় ভাইকে
মেরে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল।
আমরা ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলাম সেদিন।
আমার বোন শহরে ছিল।
ওর এক ছেলে আর
আরেকজনের আসার
অপেক্ষায় গর্ভবতী ছিল।
যে জন্ম নেবে সে জানবে না
তার বাবা কেমন ছিল।
আমার বোন তিরিশ বছরের
যৌবনে বিধবা হয়ে গেল।
তাতে শোক করার কেউ নেই।
চোখ পাথর হয়ে গিয়েছিল আগেই।
সবাই আমরা মৃত্যুভয়ে রাত জেগে
স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রোগ্রাম শুনি
রেডিওতে নিচু ভলিউমে।
সেখানে ব্যক্তিগত শোকের জন্য
মাতম করার মানসিকতা
কারো ছিল না।
আশ্চর্যভাবে আমার সদ্য বিধবা বোনও
নিজস্ব শোকের ঊর্ধ্বে থেকে
দেশের স্বাধীনতার কথা শুনত
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রোগ্রামে।
এই গানটা আমাদের খুব অনুপ্রাণিত করত—
“একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি…”
যুদ্ধের শেষ দিন দেশ স্বাধীন হয়েছে শুনে
আমরা হাজারো লোক গ্রাম থেকে
শহরের দিকে রওনা দিই।
হঠাৎ গুলির শব্দে আমরা রাস্তা থেকে
ধানক্ষেতের দিকে দৌড়াতে থাকি।
আসলে এরা পরাজিত পাক বাহিনী,
ঢাকা ফেরত যাচ্ছে ভয়ে ভয়ে
এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে।
ওদের এলোপাতাড়ি গোলাগুলিতে
নিরীহ কিছু লোক প্রাণ হারালো
স্বাধীনতার দিনও।
তবে ওদের দিকে তাকানোর কেউ ছিল না।
তখন সবাই ছুটছে শহরের দিকে
নিজেদের আপনজনের কাছে।
পাক আর্মির ট্রাকের বহর চলে যাওয়ার পর
আমরা আবার রাস্তায় উঠে এলাম।
একটা খালি ট্রাকের ড্রাইভার
আমাদের ট্রাকে উঠিয়ে নিল।
আমার গর্ভবতী বউ, কোলের মেয়ে—
শেষমেশ বাসায় ফিরি।
তখন কোনো চুরি-ডাকাতি ছিল না।
বাসা যেমন রেখে গিয়েছিলাম তেমনই আছে।
কদিন পর আমার ছোট ভাই
মুক্তিযোদ্ধার ক্যাপ্টেন হয়ে মুখে দাড়ি
লম্বা চুল কাঁধে স্টেনগান নিয়ে বাসায় ফিরল।
যুদ্ধ শেষ।
সবাই তাদের আপনজনের
খোঁজে বেরিয়েছে।
আমার ভাই লাকি—
আমরা বেঁচে আছি।
সে আর ওর বন্ধুরা আকাশের দিকে
তাক করে ফাঁকা গুলি চালাল।
শব্দে কান পাতা দায়।
তবে এই গুলির শব্দ ছিল
আনন্দের আর বিজয়ের।
কোথা থেকে এক লোক এসে বলল—
“আমাকে বাবুর্চি হিসেবে রাখবেন?”
আমি বিহারির রেস্টুরেন্টে কাজ করতাম।
ওটা বন্ধ। আমার বউ তৎক্ষণাৎ রাজি।
ওকে তখনই রান্নাঘরে নিয়ে গেল।
আসলে সে এক নিরীহ বিহারি ছিল।
আমি বউকে সে কথা জানালাম না।
মনে হল—সে মানুষ আগে পরে কী,
তা আমার জানার দরকার নেই।
আমি তো পশু না।
আমি আর যুদ্ধ চাই না।
যারা যুদ্ধ চায় আজও
তারা বোঝে না স্বজন হারানোর
ব্যথা কতটুকু।
অঙ্গহানি একজন
হুইলচেয়ারে বসে কত অসহায়—
আমি এ সবই দেখেছি।
এরপর ইরাকের যুদ্ধ,
লিবিয়ার যুদ্ধ,
আইএসআইএস-এর দৌরাত্ম্য,
ইউক্রেন–রাশিয়ার যুদ্ধ—
এখন ইরান–আমেরিকা–ইসরাইল যুদ্ধ।
সবই ঘটে যাচ্ছে এই পৃথিবীতে।
পৃথিবীতে আর কি কখনো শান্তি
দেখে যাব আমি?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর
ইউনাইটেড নেশন্স হল।
এখন এটা ঠুঁটো জগন্নাথ।
চা-পানি খেয়ে বক্তৃতা দিয়ে
বউয়ের জন্য নিউইয়র্ক থেকে শপিং করে
দেশে ফেরে সব রাষ্ট্রনায়করা।
এই পৃথিবী যুদ্ধহীন হবে—
কত বক্তৃতা!
এসব রাজনৈতিক চাল।
মুখে হাসি,
হাতে ছোরা পিঠে গোঁজা।
আমি এমন কিছু চাই না।
আমি চাই খোলা মাঠে গিয়ে
নেপোলিয়ন বা আলেকজান্ডারের মতো
যুদ্ধ করুক একে অপরের সাথে।
আমার কিছু যায় আসে না।
তাতে আমরা সাধারণ লোক মরব না।
আমি এমন যুদ্ধ চাই না
যেখানে ডিনারের থালা সহ
সপরিবারে বোমার আঘাতে
পুরো বাড়িটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
যে যুদ্ধে ধানক্ষেতে গিয়ে
কোলের মেয়ে নিয়ে লুকিয়ে থাকতে হয়—
এ যুদ্ধ আমি আর চাই না।
আমি কোনো যুদ্ধই চাই না।
পশুর মতো প্রতিপক্ষকে
হত্যা করে নির্বিকার ঘুমায়—
এমন যুদ্ধ চাই না।
আমি আর কোনো যুদ্ধ চাই না।
কলমেঃ
সোমা রানী কর্মকার
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
জাতীয় প্রতিদিনের আলোচিত কণ্ঠ
রামপুরা, বনশ্রী
ঢাকা -১২০৫