জাটকা রক্ষায় কঠোর অবস্থান, ৪০ হাজার জেলে অনিশ্চয়তায়
মোঃ জাবেদ হোসেনঃ চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে শনিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হচ্ছে দুই মাসব্যাপী মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। ইলিশের পোনা, স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘জাটকা’, সংরক্ষণ ও ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে। আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, চাঁদপুরের ষাটনল থেকে চরভৈরবী পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার অভয়াশ্রম এলাকাজুড়ে সব ধরনের জাল ফেলা, মাছ আহরণ, ক্রয়-বিক্রয়, মজুত ও পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। আইন অমান্য করলে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেলার প্রায় ৪০ হাজার নিবন্ধিত জেলের ওপর। নদীনির্ভর এসব পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস মাছ ধরা। সরকার চার কিস্তিতে ১৬০ কেজি চাল বিতরণের ঘোষণা দিলেও জেলেদের দাবি, বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির সময়ে এই সহায়তা সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট নয়। চাঁদপুর সদর উপজেলার এক জেলে জানান, “দুই মাস নদীতে যেতে পারব না। হাতে সঞ্চয় নেই। চাল পেলেও নিত্য খরচ, ওষুধ, শিশুদের পড়ালেখা—সব মিলিয়ে কষ্টে পড়তে হবে।”
বর্তমানে অনেক জেলে নৌকা ও জাল মেরামত করে সময় কাটাচ্ছেন। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।
জাটকা রক্ষায় মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে মাঠে থাকবে জেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী। নিয়মিত টহল ও নজরদারির মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, “ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। এর উৎপাদন বাড়াতে জাটকা রক্ষা অত্যন্ত জরুরি। তবে আমরা চাই, জেলেদের জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগও নিশ্চিত হোক, যাতে তারা কষ্টে না পড়েন।
ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিসুর রহমানের মতে, প্রশাসনিক কড়াকড়ির পাশাপাশি জেলেদের সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
গবেষকদের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প কর্মসংস্থান, পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ ও প্রশিক্ষণভিত্তিক আয়ের সুযোগ তৈরি করা গেলে জেলেরা এই সময়টিকে উৎপাদনশীলভাবে কাজে লাগাতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাটকা রক্ষা করা গেলে পূর্ণাঙ্গ ইলিশের উৎপাদন বাড়বে, যা জাতীয় অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এই সুফল টেকসই করতে হলে জেলে পরিবারগুলোর মানবিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, যথাযথ সহায়তা ও স্বচ্ছ তদারকি থাকলে দুই মাসের এই নিষেধাজ্ঞা সাময়িক কষ্টের বিনিময়ে ভবিষ্যতে বড় সাফল্য বয়ে আনতে পারে।