শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ১১:২৪ পূর্বাহ্ন

লাল জামা

শারমিন সুলতানা রীনা :

কোন একজন কবি বলেছিলেন দুঃখ জারণ করতে না পারলে কবি হতে পারবি না।মানুষের কিসে সুখ কিসে দুঃখ এটা বোঝার ক্ষমতা না থাকলে সে কবি কেন মানুষই হতে পারে না। ছোট বেলায় আব্বা বলেছিলেন সামনে শুক্রবার তোমাকে একটা লাল জামা কিনে দেবো। শুক্রবার আসলে আব্বাকে বোললাম আব্বা লাল জামা কিনে দেবেন না আব্বা বললেন লাল শুক্রবার আসলে কিনে দেবো। আমি আজো সেই লাল শুক্রবারের আশায় থাকি।কত জামা কাপড় কেনা হলো লাল শুক্রবারের আশ্বাস এখনো মনে দাগ কাটে।

আমার আব্বাও হয়তো এই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দুঃখটা পুষে গেছেন। আমাদের নিজেদের যখন কেনাকাটার এবিলিটি হলো আব্বা বোলতেন তোর মার জন্য একটা লাল শাড়ি কিনিস।

আব্বার পছন্দের কালার ছিলো লাল। ফড়িং এর গায়ে সুতো বেঁধে কত দুরন্ত দুপুর কাটিয়েছি সেই মৃত ফড়িং এর জন্য আজো আমার কান্না আসে। এখন একটা পিপড়ার গায়ে আঘাত লাগার ভয়ে সরে আসি। আমার মেয়েরা বিড়াল পোষে।ঘরে এগারোটা বিড়াল তাদের জন্য বড় একটা বাজেট বরাদ্দ। মাঝে মাঝে তাদেরও অসুখ বিসুখ হলে ডাক্তারের কাছে নিতে হয়। আগে রাগ হতাম চিল্লাচিল্লি করতাম কয়েকমাস হলো ভালো হয়ে গেছি একদম চুপ গেছি।

যারা লেখালেখি করেন তাদের প্রত্যকের কিছু না কিছু দুঃখ কষ্টবোধ আছে তানা হলে কলম চলে না।কবির নিজস্ব একটা দিব্যদৃষ্টি থাকে সেই দিব্যদৃষ্টি দিয়ে তিনি ঝিনুক দিয়ে কষ্ট নিংড়ে তোলেন।পৃথিবীতে যতো বিখ্যাত লেখক কবি আছেন তাদের জীবনী পড়লে বোঝা যায় কী মমতায় দুঃখ কষ্টকে লালন করে লিখে গেছেন। নিজের সন্তানের দাহ শেষ করে আসার পথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে।বসন্তের এই মাতাল সমিরনে।

নার্গিসকে ভালোবেসেছিলেন কবি নজরুল। বিয়েও হলো বাসর ঘর থেকেই তিনি পালিয়ে গেলেন তবু নার্গিসকে তিনি আজীবন ভালোবেসেছেন। জেলখানায় বসে নার্গিসকে তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন দুঃখ নামক পরশপাথর সেদিন যদি তিনি না পেতেন তাহলে অগ্নিবীনা লিখতে পারতেন না।জীবনানন্দ দাশ মাইকেল মধুসূদন দত্তের ছিলো প্রচন্ড অর্থকষ্ট। যাইহোক বিশ্বের সব সৃষ্টির মধ্য মানব স্রষ্টার মুল পুঁজি দুঃখ নামক মহাশক্তি। আপনি লেখালেখি করেন বইমেলায় আপনার প্রচুর বই বিক্রি হয় খুশী হবার কোন কারণ নেই। যারা কেনে তারা আপনার আত্মীয় অথবা কাছের কেউ বা আপনাকে খুশি করে আপনাকে দিয়েই হয়তো কোন কাজ করিয়ে নিতে পারবে। আর সত্যিকার যারা লেখক তাদের একটি লেখার জন্য প্রকৃত পাঠক সব সময় অপেক্ষা করে।

হুমায়ুন আহমেদ এর বাবা মুক্তি যুদ্ধে শহীদ হন।কী অবর্ণণীয় ভাবে মা তাদের মানুষ করেছেন।তাই হুমায়ুন আহমেদ তার লেখায় মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা যে ভাবে লিখেছেন পাঠকের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়।এবং মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের ঘটনা সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনা

প্রেম ভালোবাসা তার মতো বোধকরি কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারন নি। একজন লেখক শুধু লিখবেন তা নয় দেশ নিয়ে ভাবাও তার নৈতিক দায়িত্ব। প্রত্যেকের দল সমর্থন করার অধিকার আছে তবে লিখতে গেলে যেন আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব মানচিত্র পতাকার

সম্মান অক্ষুন্ন থাকে।

যা বলছিলাম সে জায়গাটা থেকেই সরে আসছি।

একটা লাল জামার দুঃখ। আমার বর মারা যাবার পর তার জিয়াফতের অনুষ্ঠান প্রায় এক বছর পর করতে হয়েছে।কারণ ছিলো করোনা।

অনুষ্ঠানের দিন পুরো বাড়ি লোকজনে ভরপুর ঢাকা থেকেও অনেক সাংবাদিক ভাইবোনেরা গেছেন

আমি একটা কালো শাড়ি কালো ব্লাউজ দিয়ে পড়লাম

আমার একমাত্র ননদ মণি আমাকে কিছুটা ধমকের সুরে বললো আমার ভাই কি তোমার জন্য একটা কাপড়ও রেখে যায়নাই এটা খুলে অন্য একটা পড়ো।

ওরা জানে আমি সবসময় পরিপাটি ভাবে থাকি এবং রঙিন পোশাক পড়ি। আমি তাকে বুঝালাম আজকের দিনটা আমাকে ক্ষমা কর। তোমার যা খুশি করো। ও

আর কথা বাড়ালো না।

আমি উইডো হবার পর নিজেকে চেঞ্জ করতে

হালকা কালারের পোষাক পড়তে চাইলাম আমার পরিবার আমাকে সে ভাবে দেখতে চায়না।তাই আমি আবারও আগের মতো হয়ে গেলাম।

বর মারা যাবার পর যাকে আমি আমার শশুর বাড়ির

সব চেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করেছিলাম।২০২৪ সালে আমার একমাত্র ননদটি মারা গেলো ক্যান্সারের কাছে পরাজিত হয়ে।

আমি আমার শাশুড়ীর সাথে কথা বলতে গেলে উনার চোখের দিকে তাকাতে পারিনা বড় ছেলে একমাত্র মেয়ে এবং মেয়ের একটাই ছেলে মারা যাবার পর তিনি নানাবিধ অসুখে অসুস্হ। যখন আমার শাশুড়ী আমাকে ফোন দেয় আমি মিথ্যা বলি। কাজের অজুহাত তুলি অথচ বলতে পারিনা তার চোখে আমি তিনজন মানুষের আনাগোনা দেখি।যা আমাকে বড় বেশী কষ্ট দেয়। মাঝে মাঝে তিনি গান শুনতে চান আমি হাসি আর দু একটা গানের কলি গাই।

আমি কেনো আজো বুঝি না কোথায় আমার সুখ? কোথায় আমার বেদনা আকাশের কোন দিগন্তে ডানা ঝাপটায়….

কলমেঃ

শারমিন সুলতানা রীনা

উপ-সম্পাদক

জাতীয় প্রতিদিনের আলোচিত কণ্ঠ

রামপুরা, বনশ্রী

ঢাকা -১২০৫



লাইক করুন