নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি বন্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশে সরবরাহ ব্যবস্থা ও আর্থিক খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এর বড় অংশই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও এলপিজি, যা মূলত কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে আমদানি করা হয়। সমুদ্রপথে এসব জ্বালানি দেশে আনতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করা হয়, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি রুট।
রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ মিশন অ্যাসপিডসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের বিপ্লবী গার্ডের পক্ষ থেকে জাহাজগুলোকে ভিএইচএফ বার্তার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম না করার সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। তবে ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়নি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে উঠতে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে।
এলএনজি ও গ্যাস সরবরাহে ঝুঁকি
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করে। প্রতি বছর আমদানিকৃত এলএনজি কার্গোর প্রায় ৪০ শতাংশই আসে কাতার থেকে। বার্ষিক আমদানির পরিমাণ ১ দশমিক ৮ থেকে আড়াই মিলিয়ন টনের মধ্যে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে সমুদ্রপথ বন্ধ হলে বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানাননি তিনি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম বাড়বে এবং এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এছাড়া কুয়েত, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও পরিশোধিত তেল কেনা হয়।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে জুন পর্যন্ত সরবরাহে কোনো সমস্যা নেই। মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও পরিশোধিত তেল আমদানি হচ্ছে, যেখানে হরমুজ প্রণালির সম্পৃক্ততা নেই। তবে ক্রুড অয়েলের বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এলপিজি বাজারে চাপের আশঙ্কা
দেশে বছরে অন্তত ১৪ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। মাসিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন। এলপিজির প্রায় পুরোটা আমদানি হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। চলতি বছরের শুরু থেকেই বাজারে সরবরাহ সংকট রয়েছে। সংঘাত বাড়লে এ সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়তে পারে এবং দাম বাড়তে পারে। বিকল্প উৎসের সঙ্গে আগাম যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
সরকারের প্রস্তুতি
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় বিকল্প উৎস থেকে আমদানির পরিকল্পনা বিবেচনায় রাখা হয়েছে এবং এ বিষয়ে বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় দ্রুত কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।