রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ফ্যামিলি কার্ডের নামে চেকবই চুরির অভিযোগ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে উত্তরাঞ্চলে নতুন সড়ক স্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু, ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হওয়ার সম্ভাবনা শোক সংবাদ ইন্না ইলাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন ” গার্ড অব অনারের মাধ্যমে রাষ্টীয় মর্যাদায় প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত।  সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের মুক্তি আটক নিপীড়িত সাংবাদিকদের পাশে সব সময় থাকবে বাংলাদেশ সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থা পটুয়াখালীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে পরিচ্ছন্নতা অভিযান বেলকুচিতে ১০ কেজি চাল বরাদ্দ থাকলেও পাচ্ছেন সবোর্চ্চ ৮ কেজি  ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রতিবন্ধীতা প্রতিরোধ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত চুয়াডাঙ্গায় বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান: ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের ডাক চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে চলছে নানা আলোচনায় আলহাজ্ব মশিউর রহমানের নাম

ভূরাজনীতির পরবর্তী সংঘাতের কেন্দ্র কি মিয়ানমার

ভেনিজুয়েলা থেকে ইরান—বিশ্ব রাজনীতিতে যখন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান ও সংঘাতের সুর ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে ওয়াশিংটনের পরবর্তী লক্ষ্য কোথায়। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, সে তালিকায় উঠে আসতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমার।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে হিসেবে পরিচিত দেশটির গৃহযুদ্ধ শুধু অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; বরং তা ক্রমেই ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির স্পর্শকাতর অক্ষ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্য এবং সেখানে চীনের নির্মিত কিয়াকফিউ ডিপ-সি পোর্ট এ সমীকরণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বেইজিংয়ের জন্য কিয়াকফিউ শুধু বন্দর নয়, বরং মালাক্কা প্রণালিনির্ভরতার ঝুঁকি কমিয়ে বঙ্গোপসাগর হয়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যের বিকল্প করিডোর গড়ে তোলার কৌশলগত প্রবেশদ্বার। একই সঙ্গে এটি চীনের নৌশক্তির জন্য লজিস্টিক হাব হতে চলেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কিয়াকফিউকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক ও কৌশলগত উপস্থিতির সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছে। এ প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া ‘ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট’কে শুধু নিষেধাজ্ঞার নতুন কাঠামো নয়, বরং নেপিদোর ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়ার কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে দেশটি এখন এমন এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েছে যে প্রশ্ন উঠছে বিশ্ব ভূরাজনীতির পরবর্তী বড় সংঘাতের মহড়া কি তবে মিয়ানমারেই শুরু হতে যাচ্ছে?

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে মিয়ানমারের বিরল খনিজ ভাণ্ডারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত আগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এমনকি খনিজ সমৃদ্ধ কাচিন পরিদর্শনে গিয়েছিলেন নেপিদোতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত। যদিও জান্তা সরকার টিকে থাকতে পুরোপুরি চীন ও রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় সে আলোচনা বিশেষ এগোয়নি। তবে দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান। বিশেষ করে মার্কিন কংগ্রেসে গৃহীত ‘ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট’ এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা কাঠামো মিয়ানমার ইস্যুটিকে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। প্রতিনিধি পরিষদে ৩৭৪-৩৬ ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিলটি পাস হওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই পক্ষই মিয়ানমার ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সিনেটে পাস হওয়ার পর আইনে পরিণত হলে এটি মিয়ানমারের বর্তমান ক্ষমতা কাঠামো আমূল পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে। বিলের আওতায় রয়েছে জান্তা সরকারের আয়ের প্রধান উৎস বিশেষ করে তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ খাতকে সরাসরি লক্ষ্য করে কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের ভিত্তি তৈরি করা। এছাড়া এতে মিয়ানমারের জান্তাবিরোধী গোষ্ঠী এবং জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে কৌশলগত ও ননলিথাল সামরিক সহায়তা দেয়ার পথ সুগম করা হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনকে বোঝা খুবই কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিয়ানমার ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর সে আগ্রহ কিছুটা কমে যায়। তবে এখন আবার এ বিষয়ে তাদের সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে। যার অন্যতম প্রমাণ হলো ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট। এটা অনেকটা রেজিম চেঞ্জের প্রচেষ্টার মতো। অন্তত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তার পথ এতে খোলা হচ্ছে। এ তৎপরতা গণতন্ত্র বা মানবিক উদ্বেগের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। সন্দেহ নেই তারা বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতময় পরিস্থিতি টিকিয়ে রাখতে চায়। কারণ যুদ্ধাবস্থা থাকলেই অস্ত্র শিল্প থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ বাড়ে।’

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এমন নীতির প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশগুলোর আরো বিচক্ষণ অবস্থান নেয়া প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তানে হামলা চালিয়েছিল তখন তারা পাকিস্তানকে ব্যবহার করেছিল, যার পরিণতি আমরা পরে দেখেছি। একইভাবে এখনো তাদের নিজস্ব কৌশলগত এজেন্ডা থাকতে পারে।’

শুরু থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ছিল ‘স্বার্থনির্ভর কাঠামো’ অনুসরণ করা। মানবাধিকার বা গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিবর্তে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থান সংরক্ষণের ওপর জোর দেয়। যে কারণে মিয়ানমার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের আভাস মেলে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তাঘনিষ্ঠ চার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারও করে হোয়াইট হাউজ। মূলত মিয়ানমারের রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার প্রচেষ্টার শুরু হিসেবে এ উদ্যোগ নিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল এ খাতে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে মিয়ানমারের বিরল খনিজের নিয়ন্ত্রণ নেয়া। ওই সময় সরাসরি জান্তার সঙ্গে আলোচনা করে কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মির (কেআইএ) সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র জান্তা সরকারকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি কেআইএর সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার বিকল্পও বিবেচনায় আনা হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মিয়ানমার জান্তা সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার পথ বর্তমানে অনেকটাই রুদ্ধ। বিশেষ করে ২০২৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জান্তা সরকার বৈধতার সংকটে পড়ে চীনের ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে জান্তার ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত চুক্তি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। মস্কো থেকে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ড্রোন প্রযুক্তি নেয়ার বিষয়টি ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমার জান্তা যখন এ দুই পরাশক্তির বলয়ে নিজেদের সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে প্রথম বিকল্পটি ব্যর্থ বলে মনে হচ্ছে। ফলে দ্বিতীয় বিকল্প অর্থাৎ জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরাসরি ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি এবং তাদের কৌশলগত সহায়তা প্রদানের বিষয়টিই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের মূল বিবেচনায়।

এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আইন ব্রেভ বার্মা অ্যাক্টকে অনেক পর্যবেক্ষক কেবল একটি নিষেধাজ্ঞা কাঠামো হিসেবে নয়, বরং মিয়ানমারের ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবেই দেখছেন। আইনটি এখন সিনেটে অনুমোদনের পথে। এটি কার্যকর হলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার মাত্রা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর হয়ে উঠতে পারে।

এ আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি মিয়ানমারের সামরিক সরকারের আর্থিক ভিত্তিকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে প্রতি বছর মিয়ানমারের প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোর করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান মিয়ানমার অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে দেশটির আর্থিক প্রবাহকে সংকুচিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ দুটি প্রতিষ্ঠানই মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান আয়ের উৎস। ফলে এগুলোর ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করা হলে রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং সামরিক সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

এছাড়া ব্রেভ বার্মা অ্যাক্টের আওতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) মিয়ানমারের ভোটাধিকার কার্যত স্থগিত করার প্রস্তাবও রয়েছে। ফলে দেশটি আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ হারাতে পারে। একই সঙ্গে মিয়ানমারে বিমান জ্বালানি সরবরাহকারী বিদেশী কোম্পানিগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের যুক্তি অনুযায়ী, এর মাধ্যমে মিয়ানমারের বিমান বাহিনীর সামরিক অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠবে। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থলপথে সুবিধা করতে না পেরে জান্তা সরকার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বিমান হামলার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। এ আইন বাস্তবায়নের জন্য একটি নতুন মার্কিন বিশেষ দূত নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনেল আইনটির পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক সরকারের পরিকল্পিত নির্বাচন অঞ্চলটিতে চীনের প্রভাব আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।’ তার মতে, এ আইনের মাধ্যমে জান্তা সরকারের অর্থায়নের পথ বন্ধ করা এবং একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব প্রতিহত করা সম্ভব হবে।

বার্মা অ্যাক্ট নামে এ ধরনের আইন আগেও ছিল জানিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগের তুলনায় এবারের পদক্ষেপ অনেক বেশি কঠোর। সামরিক জান্তার সক্ষমতা কমিয়ে আনতেই এ ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধের সরঞ্জাম ও জ্বালানি সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার লক্ষ্য হলো জান্তা বাহিনীর হামলা চালানোর সক্ষমতা দুর্বল করে দেয়া।’ বিদ্রোহীদের সহায়তা করতেই মূলত এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য মিয়ানমারের ক্ষমতা কাঠামোকে এমনভাবে দুর্বল করা যাতে দেশটি চীনের কৌশলগত করিডোর হিসেবে পুরোপুরি কার্যকর হতে না পারে। বিশেষ করে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো যদি অস্থিরতার মধ্যে পড়ে তাহলে তা বেইজিংয়ের বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দিতে পারে।

পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক তথা ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব ঠেকাতেও যুক্তরাষ্ট্র তৎপর। যেখানে ওয়াশিংটনের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে রাখাইন রাজ্যে নির্মিত চীনের কিয়াকফিউ ডিপ-সি পোর্ট। বঙ্গোপসাগর ঘিরে কিয়াকফিউ ডিপ-সি পোর্ট চীনের বাণিজ্যিক ও সামরিক কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে। যার অন্যতম কারণ দেশটির দীর্ঘদিনের কৌশলগত দুর্বলতা বা ‘মালাক্কা ডিলেমা’। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরগুলো থেকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা বা ইউরোপে যেতে মালাক্কা প্রণালি পেরিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর হয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর প্রভাব বলয়ের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই এটিকে কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে দেখে। এ জায়গাতেই কিয়াকফিউ বন্দর চীনের জন্য শক্তিশালী বিকল্প পথ খুলে দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরের ওপর সরাসরি মুখ থাকা কিয়াকফিউ ডিপ-সি পোর্ট থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত স্থলভাগের পাইপলাইন ও হাইওয়ে সংযোগ তৈরি হওয়ায় বেইজিং ‘স্ট্রেইট অব মালাক্কা বাইপাস’ কৌশল বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। এ রুটটি চীনকে মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে দ্রুত ও নিরাপদ বাণিজ্যপথ ব্যবহারের সুযোগ দেবে। জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি চীনের জন্য একটি ‘কোর নোড’ বা প্রধান কেন্দ্র। একই সঙ্গে এটি চীনের নৌশক্তির জন্য লজিস্টিক সুবিধা তৈরি করছে। অনেকে মনে করেন, এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক অবকাঠামো নয়; বরং ভারত মহাসাগরে চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতিকে শক্তিশালী করার সম্ভাব্য সামরিক-লজিস্টিক নেটওয়ার্কের অংশ।

এ বাস্তবতাই যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কারণ ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগরে চীনের বন্দরভিত্তিক উপস্থিতি যত বাড়ছে, ততই আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনাও বাড়ছে। চীনের এ বন্দর নেটওয়ার্ক ভারত মহাসাগরে এমন এক ছায়া ফেলেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বাধ্য হয়ে পাল্টা কৌশল সাজাতে হচ্ছে। সে পাল্টা কৌশলের সবচেয়ে সংগঠিত রূপটিই হলো যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার ‘কোয়াড’ জোট।

এ বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের রাখাইনের গুরুত্ব আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে রাখাইন চীনের জন্য বিকল্প করিডোর, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক ভারসাম্যের স্পর্শকাতর বিন্দু। ফলে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, জান্তা সরকারের ভবিষ্যৎ, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান, রাখাইনের বন্দর এবং উত্তরাঞ্চলের খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চল বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হয়েছে। ঠিক এ কারণে মিয়ানমারে সম্ভাব্য ‘রেজিম চেঞ্জ’, অর্থনৈতিক অবরোধ, বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সমর্থন এবং সামুদ্রিক করিডোর নিয়ন্ত্রণ একই কৌশলগত ছাতার নিচে এসে দাঁড়াচ্ছে।

মিয়ানমারের ক্ষমতা কাঠামো পরিবর্তনের সম্ভাব্য সমীকরণে রাখাইনের কৌশলগত গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে সেখানে জান্তাবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি। গত কয়েক বছরে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের ভেতরে সবচেয়ে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা সংগঠনগুলোর এটি অন্যতম। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা সরাসরি আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। মিয়ানমারের অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন বা আঞ্চলিক মিলিশিয়ার মতো পরিচালিত হলেও আরাকান আর্মি তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত সামরিক কমান্ড, প্রশাসনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে এগিয়েছে। স্থানীয় জনগণের মধ্যে একটি সমর্থনও রয়েছে তাদের। যে কারণে গৃহযুদ্ধের ভেতরে তারা কেবল একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, বরং বিকল্প আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এছাড়া চীনের অর্থনৈতিক চাপ ও মধ্যস্থতায় বিভিন্ন অঞ্চলে বেশকিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী সামরিক জান্তার সঙ্গে অস্ত্রবিরতি চুক্তি করেছে। কিন্তু রাখাইনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে আরাকান আর্মি এখন পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ কিয়াকফিউ বন্দর অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে মাত্র যে তিনটি জান্তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তার অন্যতম কিয়াকফিউ। এটির নিয়ন্ত্রণ নিতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আরকান আর্মি।

এ কারণেই অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের ভবিষ্যৎ শুধু রাজধানী নেপিদো বা উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত সংঘাত দিয়ে নির্ধারিত হবে না, বরং তার বড় অংশ নির্ভর করবে রাখাইনের পরিস্থিতির ওপর। কারণ এ অঞ্চলই একদিকে বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক করিডোরের প্রবেশদ্বার, অন্যদিকে চীনের জ্বালানি ও বাণিজ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নোড। সে কারণেই রাখাইন কেবল প্রাদেশিক সংঘাতের ক্ষেত্র নয়—এটি ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রীয় অক্ষ।

 

তবে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর চাপ মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বকে সহজে নতি স্বীকার করাবে বলেও মনে করেন না অনেক পর্যবেক্ষক। তাদের মতে, নতুন নিষেধাজ্ঞা ও চাপ অনেক সময় উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে সামরিক নেতৃত্বকে আরো কঠোর অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিয়ানমারে চীনের প্রভাব যেভাবে বাড়ছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিয়ে কৌশলগতভাবে ভাবতেও পারে। নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও চীন সেই প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিয়েছে, রাশিয়াও সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। তবে পরিস্থিতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিবিড় নজর থাকলেও এ মুহূর্তে সেখানে বড় ধরনের হস্তক্ষেপ বা অবস্থান পরিবর্তনের মতো স্পেস খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি ক্রমেই জান্তা সরকারের অনুকূলে গেছে। তারা কয়েকটি হারানো অঞ্চল পুনর্দখলও করেছে। ফলে দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে যে সুযোগ ছিল, এখন তা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে।



লাইক করুন