রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০২:২৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ফ্যামিলি কার্ডের নামে চেকবই চুরির অভিযোগ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে উত্তরাঞ্চলে নতুন সড়ক স্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু, ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হওয়ার সম্ভাবনা শোক সংবাদ ইন্না ইলাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন ” গার্ড অব অনারের মাধ্যমে রাষ্টীয় মর্যাদায় প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত।  সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের মুক্তি আটক নিপীড়িত সাংবাদিকদের পাশে সব সময় থাকবে বাংলাদেশ সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থা পটুয়াখালীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে পরিচ্ছন্নতা অভিযান বেলকুচিতে ১০ কেজি চাল বরাদ্দ থাকলেও পাচ্ছেন সবোর্চ্চ ৮ কেজি  ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রতিবন্ধীতা প্রতিরোধ বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত চুয়াডাঙ্গায় বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান: ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের ডাক চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে চলছে নানা আলোচনায় আলহাজ্ব মশিউর রহমানের নাম

লম্বা চুল বব কাট করে ফেলেছে যে মেয়েটা! ঐটা আমার প্রেমিকা! কন্ট্যাক্ট প্রেমিকা!জেসমিন ! 

ইয়াসির আরাফাত মিলন: ‘জেসমিন’ গল্প উপন্যাসে সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত একটা নাম! অবশ্য এরও একটা যৌক্তিক কারণ আছে। জগতের সব জেসমিনই মারাত্মক সুন্দর! জেসমিন এর কথাই বলছি আপনাদের!

আজ মার্চের ১৩ তারিখ।

আজ জেসমিনের বিয়ের দিন ছিল! আবীরের সাথে। আবীর আজাদ! বুয়েট!

বিয়েটা ভেঙে গেছে বলে আমার খুশী হওয়া উচিত কিন্তু আমি মোটেও খুশি হতে পারছি না। জেসমিন আবীরকে বেশী পছন্দ ছিল!

সে যাক গে!

শুনুন তাহলে,

আমি দাঁড়িয়ে আছি শাহবাগ মোড়ে। ফুলের দোকানে। জেসমিন একগুচ্ছ ফুল দিয়ে আমি চলে যাবো, আমার দায়িত্ব শেষ! আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে চাই- জেসমিন আমাকে ভালোবাসে না! আমাদের প্রেমটা ছিল কন্ট্যাক্ট প্রেম! আর আজ এই প্রেমের শেষ দিন!

জেসমিন তার লম্বা চুল কেটে বব কাট করে ফেলেছে, এর পেছনে একটা লম্বা গল্প আছে। আবীর জানে, আমিও জানি! সেই গল্প বলতে গেলে ঘন্টা পেরিয়ে যাবে!

২০২৬ সাল যেদিন শুরু হল, ঐদিন জেসমিন এর সাথে আমার প্রেমের শুরু! আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই। ঐদিন প্রচন্ড শীত পড়েছিল। দেশেই তুষাড়পাতের মত শীত। তুষারের চেয়ে কুয়াশা বৃষ্টি বেশী ছিল বলে, নেটিজেন রা এর নাম দিয়েছিল লো বাজেটের তুষারপাত!

জেসমিন ববকাট চুলে আমার সামনে দাঁড়ালো!

-তুমি না আমাকে ভালোবাসতে?

জেসমিন হঠাত এই প্রশ্নে আমি থতমত খেয়ে তোতলাতে লাগলাম।

-ন্যাকামি করো না তো। সোজাসাপ্টা বলো

-কি হয়েছে জেসমিন ?

-দেখছো না চুল কেটে ফেলেছি, বিশ্রী লাগছে না আমাকে?

-নাহ!

-মিথ্যে বলো না।

-মিথ্যে বলছি না!

-তাহলে বলো, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?

-হু

আমি বাধ্য ভঙ্গিতে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিলাম- ভালোবাসি। তবে কথাটা সত্য। ভালোবাসি! আবীরের সাথে জেসমিনের প্রেম অনেক আগে থেকেই, তাই আমার চান্স হয়নি কখনোই।

তবে এই প্রেমে একটা সমস্যা আছে।

তবে সমস্যা যদি প্রেমে রূপ নেয়। তাহলে সেই সমস্যা কে আর সমস্যা বলা যায় না।

আবীরের চেয়ে আমি কম কিসে?

আমি মেডিকেল আবীর বুয়েট

আমি ডাক্তার আবীর ইঞ্জিনিয়ার!

মেডিকেলে আমার সাবজেক্টের নাম অনকোলজী বা কর্কটরোগ!

কর্কট শব্দটা অনেকেই চেনেন না। কর্কট রোগ মানে হল ক্যান্সার! গত দু বছরে চার বার ফেল মেরেছি কোর্সে! আর একবার ফেল মারলে কোর্স আউট! নিজেকে আজকাল গর্ধব লাগে। এই গর্ধবকে বাদ দিয়ে জেসমিন তাই আবীরকেই বেছে নিয়েছিল। ওর পছন্দ যৌক্তিক।

যে স্যার আমার কোর্স কোর্ডিনেটর, তার নাম গালিব! মির্জা গালিব নয়। শুধু গালিব। গালিব জোয়ার্দার। এ বছর উনার চাকরী চলে গেছে।

কেন চাকরি চলে গেছে সেটাও বলছি!

জেসমিন প্রসঙ্গে আসি।

সত্যি বলতে জেসমিনের সাথে কন্টাক্ট প্রেম শুরুর পর থেকেই আমি পড়ালেখায় মনোযোগী হয়েছি। আজকাল ২৪ ঘন্টায় ২৬ ঘন্টা পড়ি। পড়তেই থাকি। প্রেমের কি অদ্ভুত শক্তি তাই না? আমি থাকি আজীজ সুপার মার্কের্টের ডক্টরস মেসে! জেসমিন সাথে আমার দেখা হয় সন্ধ্যায়! পিজির সামনে বসে আমরা চা খাই। রঙ চা!

জেসমিন আজকাল প্রচন্ড মন খারাপ থাকে। ওর কেবল একটাই প্রশ্ন-

-আমি কি খুব বিশ্রী হয়ে যাচ্ছি?

-নাহ

-মিথ্যে বলো না

-মিথ্যে বলছি না

-আমার চুল পড়ে যাচ্ছে

-কই নাহ!

-আমাকে খুশি করতে হবে না

-খুশি করছি না।

জেসমিনের ধারণা, আমি প্রচন্ড মিথ্যে বলি। আমার সব কথাই ওকে খুশি করতে। কথা টা সত্য নয়। আমি যা বলি সত্যি ই বলি! অযথাই জেসমিনের ধারণা ও দিন দিন অসুন্দর হয়ে যাচ্ছে। ওর চুল পড়ে যাচ্ছে!

আমার কোর্স কো-অর্ডিনেটর গালিব স্যারও জেসমিনের ব্যাপারে জানেন। এই স্যার ই গত দু বছরে ৪ বার ফেল করিয়েছেন আমাকে। ভাইভার টেবিলে অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন করতেন তিনি-

– ক্যান্সার যে কোন রোগ নয় তুমি তা জানো?

-স্যার এটা তো ক্রোনিক ডিজিজ!

-কালো জিরায় ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদান কি কি?

-জানি না স্যার

-ভিটামিন B-18 সম্পর্কে বলো!

-এই নামে তো কোন ভিটামিন নেই স্যার

-শোন, ক্যান্সার কোন রোগ নয়, এটা হলো B-18 কমপ্লেক্সের অভাব। এই ভিটামিন লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ঔষধ কম্পানির ব্যবসা চালু রাখতে!

আমি চুপ মেরে গেলাম! B-18 নামে মেডিকেল সায়েন্সে আসলেই কোন ভিটামিন নেই।

এখন এ কি ধরণের প্রশ্ন!

গত দুই বছরে গালিব জোয়ার্দার স্যারের কাছে কেউ পাশ করে নি। এ নিয়ে একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ।

তদন্তে এক অদ্ভুত তথ্য বেরিয়ে এলো।

তথ্য টা হলো- মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন প্রফেসর গালিব জোয়ার্দার!

পত্রিকায় এ নিয়ে রিপোর্টও হয়েছিল। তদন্তের পর উনাকে জোর করে অবসরে পাঠানো হয়!

জেসমিন প্রসঙ্গে ফিরি!

জেসমিনের চুল গুলো ছিল অনেক লম্বা। দিঘল কেশ। ঐ গানটা বেশ মিলে যেত।

কণ্যার চিরল বিরল চুল,

তাহার কেশে জবা ফুল।

সেই ফুল পানিতে ফেলে কণ্যা করলো ভুল!

আবীরকে ভালোবেসে জেসমিন হয়ত ভুল ই করেছিল। আবীর জেসমিন কে ছেড়ে গিয়েছিল।

যে কারণে ছেড়ে গিয়েছিল, সত্যি ই ভালোবাসলে এ কারণে ছেড়ে যেত না।

গালিব জোয়ার্দার স্যারের চাকরি চলে যাওয়ার আমি উনার খোঁজ নিয়েছিলাম। আমি একটা অদ্ভুত তথ্য জানতে পারি। গালিব জোয়ার্দার স্যার একটি ব্যক্তিগত ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট সেন্টার খুলেছেন। সেন্টারটা সঙ্গত কারণেই গোপন রেখেছেন। সেই সেন্টার থেকে ক্যান্সার চিকিতসা করে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছে ১০০+ ক্যান্সার রোগী!

জেসমিন !

জেসমিন সেই ১০০ জনের ১ জন!

ওহ!

বলাই হয়নি।

জেসমিনের যখন ক্যান্সার ধরা পড়লো, তখন ই আবীরের সাথে ওদের প্রেমের ফাটল ধরলো। টানা ১০ বছরের প্রেম ছিল ওদের।

জেসমিনের ক্যান্সার। কেমো থেপারী শুরু হলো। ওর লম্বা চুলগুলো পড়ে যেতে লাগলো।

রাগে দু:খে মেয়েটা লম্বা চুল কেটে বব কাট করে ফেলল। যেন বোঝা না যায় ওর চুল পড়ে যাচ্ছে।

সে সময় জানা গেল

আবীরের বিয়ে। ওর ব্যাচমেট সুর্বণা কে বিয়ে করছে আবীর। অথচ এই আবীরের সাথেই জেসমিনের ১০ বছরের প্রেম!!

সেদিন সন্ধ্যায় খুব কেঁদেছিল জেসমিন ।

আমি নির্বাক তাকিয়েছিলাম! জেসমিন বলেছিল

-আমাকে না তুমি ভালোবাসতে?

-হু

-আমাকে এই কটা দিন ভালোবাসতে পারবে?

-হু

-ক্যান্সারের কটা দিন? এরপর তো মরেই যাবো!

-হু

আমি বাধ্য ছেলের মত চুপচাপ ‘হু’ বলেছিলাম শুধু! জেসমিন অঝোরে কাঁদছিল!

আজ মার্চ ১৩!

আজ আমাদের সেই ভালোবাসার শেষ দিন।

শেষ দিন কারণ- এখন জেসমিনর ক্যান্সার নেই!

আবীরের সাথে আবার সব ঠিক হয়ে গেছে।

কিছুদিন আগে সুবর্ণার সাথে আবীরের ডিভোর্স হয়ে গেছে।

সুতরাং আমার দায়িত্ব শেষ!

আমি ফুল কিনতে এসেছি জেসমিন এর জন্য। এই ফুল গুলো নিয়ে জেসমিন আজ আবীরের বাসায় যাবে। এ মাসেই শেষেই হয়ত ওদের বিয়ে!

দুপুরের পর থেকে আকাশে মেঘ।

সন্ধ্যা নাগাদ একটা ঝুম বৃষ্টির সম্ভাবনা। বৃষ্টির সাথে মানুষের আবেগের অদ্ভুত মিল। বৃষ্টি যেন খুঁজে খুঁজে মানুষের আবেগের সময়গুলোতেই আসে! ঝুম করে!

আমি দাঁড়িয়ে আছি শাহবাগ মোড়ে আমার হাতে অর্কিড, লিলি আর জারবেরা দিয়ে বানানো ফুলের তোড়া!জেসমিন রিক্সা আমার সামনে এসে থামলো।

-তারাতারি যেতে হবে বুঝছো। আকাশ মেঘলা। বৃষ্টি আসবে মনে হয়?

-হু

-তুমি কি এই ‘হু’ ছাড়া কিছুই বলতে পারো না?

-হু

-আমার চুলগুলো আবার বড়ো হয়ে যাচ্ছে না?

-হু

জেসমিনের বব কাট চুলগুলো আবার দীঘল হয়ে উঠছে। জেসমিন এখন পুরোপুরি সুস্থ। কি দারুণ উচ্ছল লাগছে ওকে!

আবীর ছেলে টা ভাগ্যবান। খুব ই ভাগ্যবান।

আমি ফুলের তোড়া টা জেসমিনের হাতে দিলাম। বললাম

-আমি তাহলে আসি জেসমিন

-আচ্ছা। ভালো থেকো তুমি!

-হু

আমি টিএসসি’র দিকে হাঁটা দিলাম।

আকাশে মেঘ বেড়েছে। দ্রুতই বৃষ্টি নামবে। এই বৃষ্টি ভিজিয়ে দেবে পুরো শহর!

আমি তখন গিয়ে বসবো কোন একটা চায়ের দোকানে, ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে যাবে পুরো শার্ট! এক কাপ মাল্টা চা হলে মন্দ হবে না!

বুকটা ভার ভার লাগছে।

এই ভার লাগা টা অকারণেই! আচ্ছা আকাশেরও কি এমন হয়? তাই কি এমন বে-মাতাল বৃষ্টি আসে?

বলতে বলতেই ঝম ঝম করে বৃষ্টি নেমে পড়ল। টিএসসি পর্যন্ত পোঁছানো গেল না। রাস্তার মানুষগুলো দৌড়ে গিয়ে আশেপাশের কোন ছাউনিতে ঠাঁই নিল। আমি হেঁটে চললাম।

বৃষ্টি আজ ভিজিয়ে দিক পুরো দেহ মন!

-এই ছেলে এই!

আমার ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালো একটা রিক্সা! আমি থমকে দাঁড়ালাম

জেসমিন !

-রিক্সা তে ওঠো

-কেন?

-ওমা একাই ভিজবা তুমি?

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম! জেসমিন বলল

-উঠে এসো তো!

আমি বাধ্য ছেলের মত রিক্সায় জেসমিনের পাশে বসলাম। বৃষ্টি বেড়ে গেল। ঝুম বৃষ্টি। জেসমিন মৃদু স্বরে বলল-

-এ কটা দিনের মত সারা জীবন কি আমার পাশে থাকা যায়? যদি আবার ক্যান্সার হয়, যদি আমি বিশ্রী হয়ে যাই? সব চুল পড়ে যায়?

বৃষ্টির শব্দের সাথে কথা গুলো মিশে গেল!

আমার গলায় কি যেন আটকে এলো, কিছুই বেরুলো না মুখে! অথচ আমি খুব করে বলতে চাচ্ছি-

-যদি পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে যায়, আর ক্যান্সার তোমায় সবচেয়ে বিশ্রী নারী বানিয়ে দেয়। সেদিনও আমি তোমার পাশে বসে হাতটা ধরে বলতে চাই- ভালোবাসি জেসমিন !

অথচ

কিছুই বেরুচ্ছে না মুখ দিয়ে।

আমার চোখেও কি জল? জানি না!

ঝুম বৃষ্টি বলে আমি আর জেসমিন কেউ ই সেই জল টের পাচ্ছি না!

বৃষ্টি বাড়ছে!

বেড়েই চলছে। রিক্সায় হুড নামিয়ে দিয়েছে জেসমিন !

ভালো লাগছে! অদ্ভুত রকম ভালো লাগছে!

না থামুক এই বৃষ্টি!

কলমেঃ

ইয়াসির আরাফাত মিলন

সম্পাদক ও প্রকাশক

জাতীয় প্রতিদিনের আলোচিত কণ্ঠ

রামপুরা, বনশ্রী

ঢাকা -১২০৫



লাইক করুন