নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতি ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। গত চার বছরে এ অঞ্চলে প্রায় ৪৪ থেকে ৪৮ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে ভয়েস ফর রিফর্ম ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এ তথ্য তুলে ধরেন। ইরান যুদ্ধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে যুদ্ধের প্রভাব শীর্ষক ওই সভায় তৈরি পোশাক খাত, জ্বালানি, বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং আমদানি-রফতানিসহ বিভিন্ন খাতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়।
ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় বক্তারা জানান, প্রতিবছর প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে যান। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের ওপর চাপ অনেকটাই কমে। তবে চলমান সংঘাতের কারণে ফ্লাইট সীমিত হওয়ায় নতুন শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়া ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ তথ্য দেন যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রধানত তিনটি পথে প্রভাব ফেলতে পারে। এগুলো হলো জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য, রফতানি এবং প্রবাসী কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স। তার মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হওয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি সরবরাহে বাধা তৈরি হতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে সরকারের আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাড়তে পারে। এতে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও কৃষি খাতেও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির সাবেক পরিচালক ও গার্মেন্টস উদ্যোক্তা শামস মাহমুদ তথ্য দেন যে গার্মেন্টস খাত ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শিপিং সময় বেড়ে গেলে বাংলাদেশের দ্রুত পণ্য সরবরাহের সুবিধা কমে যেতে পারে। এতে ইউরোপীয় ক্রেতারা তুরস্ক, মিসর বা কাছাকাছি অন্যান্য দেশে অর্ডার স্থানান্তর করতে পারেন। তিনি আরও জানান, গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুতের মানজনিত সমস্যার কারণে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না এবং টেক্সটাইল মিলগুলোর উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম তথ্য দেন যে দেশের প্রাথমিক জ্বালানির প্রায় ৬২ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এলএনজি ও তেলের দামের সামান্য পরিবর্তনও সরাসরি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ প্রতি বছর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আমদানিতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, যার মধ্যে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও অন্তর্ভুক্ত।
বায়রার সাবেক মহাসচিব শামিম আহমেদ চৌধুরী নোমান জানান, সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে প্রকল্প বা কর্মসংস্থান কমে গেলে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক দেশে ফিরে আসার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে বেকারত্বের চাপ বাড়তে পারে। তিনি শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপ, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য নতুন বাজারে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়নে আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ আসিফ খান তথ্য দেন যে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব দেশের পুঁজিবাজারেও পড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও সার খাতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আলোচনা সভায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সাবাব খান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে মতামত উপস্থাপন করেন।