সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৪:০৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
আলমডাঙ্গায় ৮৭টি মাদ্রাসা ও এতিমখানায় সৌদি আরবের উপহার খেজুর বিতরণ চুয়াডাঙ্গায় জেলা পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত: ঈদে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আর্জেন্টিনা–স্পেন ফিনালিসিমা বাতিল পশ্চিমবঙ্গে পুরোহিত ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক ভাতা বৃদ্ধি ইরানের হামলায় নেতানিয়াহু নিহতের গুঞ্জন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রত্যাখ্যান আল্লাহ কদরের রাতকে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী জামায়াত আমির হুঁশিয়ারি: সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে নামা হবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ, মেহেরপুরে কথিত সাংবাদিক আটক   ৪২ জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত দক্ষ নেতৃত্বে আলমডাঙ্গায় প্রশাসনিক গতি: একাধিক দায়িত্ব সামলে সুনাম কুড়াচ্ছেন ইউএনও পান্না আক্তার

অস্থির ডলার বাজার, বাড়ছে বিনিময় হার

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত থাকলেও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে ডলারের বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম প্রায় ১ টাকা বেড়েছে এবং টাকার মান কিছুটা দুর্বল হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত ওঠে। সপ্তাহের শুরুতে এই হার ছিল প্রায় ১২২ টাকা ৫০ পয়সা। কয়েক দিনের মধ্যেই ডলারের দামে এই বৃদ্ধি বাজারে নতুন চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জ হাউসেও ডলারের দর বেড়েছে। বৃহস্পতিবার অনেক এক্সচেঞ্জ হাউসে ডলার বিক্রি হয়েছে ১২৬ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকা সত্ত্বেও ডলারের দর বৃদ্ধি বাজারে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও পড়তে শুরু করেছে। সম্ভাব্য জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় কিছু ব্যাংক তুলনামূলক বেশি দামে ডলার লেনদেন করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বুধবার ১১ মার্চ আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৫৮ পয়সা। বৃহস্পতিবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২২ টাকা ৬৯ পয়সায়। এর আগে সোমবার এই হার ছিল ১২২ টাকা ৪৯ পয়সা এবং রোববার ছিল ১২২ টাকা ৪৩ পয়সা।

ডলারের দাম বাড়ার প্রভাব আমদানিকারকদের ওপরও পড়তে শুরু করেছে। চট্টগ্রামভিত্তিক একটি শিল্পগোষ্ঠীর একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে ডলারের প্রকৃত ঘাটতি না থাকলেও কিছু ব্যাংক ভবিষ্যতের ঝুঁকি বিবেচনায় বেশি দামে ডলার বিক্রি করছে। এলসি খোলার সময় কিছু ব্যাংক প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা পর্যন্ত দর চেয়েছে। ফরওয়ার্ড সেল বা ভবিষ্যৎ চুক্তির ক্ষেত্রে এই দর আরও বেশি নির্ধারণ করা হচ্ছে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যেও ডলারের দর নির্ধারণে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ডলার বিক্রির জন্য ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা এবং কেনার জন্য ১২১ টাকা ৬৮ থেকে ১২১ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করেছে। বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংক বিক্রির জন্য ১২২ টাকা ৯৫ পয়সা এবং কেনার জন্য ১২১ টাকা ৯৫ পয়সা নির্ধারণ করেছে। ঢাকা ব্যাংক বিলস ফর কালেকশনের ক্ষেত্রে বিক্রির জন্য ১২২ টাকা ৯৯ পয়সা এবং কেনার জন্য ১২১ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করেছে। অপরদিকে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে ১২২ টাকা ৯০ পয়সায় এবং কিনেছে ১২১ টাকা ৬০ পয়সায়।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসান জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ব্যাংক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা বিবেচনায় রেখে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তার মতে, প্রকৃত প্রভাব বোঝার জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে না। টাকার মান ধরে রাখতে রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাজার থেকে ডলার কেনাও বন্ধ রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ৫ বিলিয়নের বেশি ডলার কিনেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ১১ মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৯ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে এবং এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মাসরুর রিয়াজ জানান, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এলএনজি ও জ্বালানির দাম বাড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালান্স অব পেমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে রফতানি আয় কমে ২৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৬ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়ে ৩৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জানান, আমদানি ব্যয় বাড়া এবং রফতানি আয় কমার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।

তবে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৫ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে ৩৮১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আগের বছরে একই সময়ে তা ছিল ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখা এবং রিজার্ভ সংরক্ষণ করা বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



লাইক করুন