মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৩২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
তাড়াশে সিএনজি চালকের মরদেহ উদ্ধার  তাড়াশে নববুধসহ দু নারীর মৃত্যু অযত্ন-অবহেলায় ঝোপজঙ্গলে ঢেকেছে বেলকুচি টেলিফোন অফিস, পরিত্যক্ত ভবনে মাদকসেবনের অভিযোগ তাড়াশে এক ব্যক্তির বাধায় এডিপির অর্থায়নে গ্রামবাসীর একমাত্র চলাচলের রাস্তার কাজ বন্ধ চলাচলের রাস্তায় ঈদগাহ মাঠের প্রাচীর তাড়াশে অবরুদ্ধ ৪০টি পরিবার তাড়াশে গ্রাম্য বিরোধে একমাত্র রাস্তায় বেড়া দিয়ে অবরুদ্ধ দুটি পরিবার এনায়েতপুরে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা হাসমত উল্লাহর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন এনায়েতপুরে নারী হেল্প ডেক্স সেবা সম্পর্কে অবগত করন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা মূলক সভা অনুষ্ঠিত ‎ সলঙ্গায় চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ধরায় অপহরণের চেষ্টা, ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা বেলকুচিতে প্রভাব দেখিয়ে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা, আতঙ্কে বৃদ্ধ পরিবার 

বাংলাদেশ নামক বর্তমান ভূখন্ডে রেল চলাচল শুরু হওয়ার ১৬২ বছর পূর্ণ হলো আজ

বিশেষ প্রতিনিধিঃ কলকাতা থেকে চুয়াডাঙ্গা হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের লক্ষ্যে ১৮৫৯ সালে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি গঠিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল পদ্মা নদীর উপর সেতু তৈরি করে ঢাকা পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারিত করা।

ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে সর্বপ্রথম রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে (EBR)। ইবিআর-এর ১৮৫৭ সালের নথি মোতাবেক প্রস্তাবিত রেলপথের বর্ণনা এমন : “From Calcutta to Khoostie and thence eventually to Dacca, – with proposed Branches to Darjeeling, Gowhatty in Assam, Sylhet, and Cherra Punjee Hills.” সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কলকাতা থেকে শুরু করে রানাঘাট, বানপুর, চুয়াডাঙ্গা ও পোড়াদহ হয়ে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত এর ব্রডগেজ রেল লাইনটিই বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে স্থাপিত সর্বপ্রথম রেলপথ। আর এই পথে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছিল আজ থেকে ঠিক ১৬২ বছর আগে ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ নভেম্বর (এই দিনে)। বর্তমান বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডের মধ্যে স্থাপিত প্রথম রেলস্টেশন হলো চুয়াডাঙ্গা (তখন পর্যন্ত দর্শনা রেলস্টেশন তৈরি হয়নি)।

প্রথম পর্যায়ের নির্মাণকাজের জন্য কন্সট্রাকশন ডিভিশন ছিল কলকাতায়, দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য বাগুলায় এবং তৃতীয় পর্যায়ের জন্য কন্সট্রাকশন ডিভিশন ছিল পোড়াদহে। রেলপথ তৈরির কারিগরি রীতি মোতাবেক যে কোনো রেলপথ নির্মাণ শুরু হয় Base Station থেকে- যা ক্রমান্বয়ে অগ্রবর্তী হয়ে পর্যায়ক্রমে End Station)-এ গিয়ে শেষ হয়। এই নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওই রেলপথের ওপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন রেলস্টেশন, কালভার্ট, সেতু, ইত্যাদি কাঠামো নির্মিত হয়ে থাকে। সেই রীতি মোতাবেক ওই রেলপথটির নির্মাণ শুরু হয় কলকাতা থেকে এবং পর্যায়ক্রমে তা শেষ হয় বর্তমান কুষ্টিয়ার সন্নিকটে জগতিতে।

ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি উপরোক্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে রানাঘাট থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। প্রথম রেলের ইঞ্জিন ছিল বাষ্পচালিত আর বগীগুলো ছিল কাঠের তৈরি। এই রেলপথ স্থাপন প্রসঙ্গে কুমুদনাথ মল্লি­ক তাঁর ‘নদীয়া কাহিনী’তে লিখেছেন :

”সার সিসিল বাহাদুরের শাসনকাল নানারূপে নদীয়ায় স্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে। ইঁহারই সময় ইস্টারন বেঙ্গল রেলওয়ে কলিকাতা হইতে নদীয়ার উত্তর সীমা কুষ্টিয়া পর্যন্ত— প্রথম খোলা হয়। কার্যত এই রেল খুলিবার প্রায় দশ বৎসর পূর্ব্বে ১৮৫২-৫৩ খ্রিস্টাব্দে ইহার নিমিত্ত প্রথম প্রস্তাব উত্থিত হয়। তদনুসারে ১৮৫৪ অব্দে লেফটেন্যান্ট গ্রেট হেড নামক একজন দক্ষ এনজিনিয়ার কলিকাতা হইতে ঢাকা, তথা হইতে চট্টগ্রাম ও তথা হইতে আকোয়াব পর্যন্ত জরিপ করিতে নিযুক্ত হন।

ইতিমধ্যে মিষ্টার পাউন নামে একজন এনজিনিয়ার কলিকাতা হইতে কুষ্টিয়া পর্যন্ত পথের নক্সা ও পদ্মার উপর একটি ব্রীজের অদর্শ অঙ্কন করিয়া গভর্ণমেণ্টে পেশ করেন। তদানুসারে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ৩০ জুলাই ১৪৭৫৯৬৭২ পাউণ্ড মূলধনে লণ্ডনে ইস্টারণ বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি গঠিত হয়। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর তারিখে ঐ পথের কণ্ট্রাক্ট বিলি হয়। পরে ১৮৬২ অব্দের ১৫ নভেম্বর তারিখে ঐ পথে প্রথম যাত্রী গাড়ী চলিয়াছিল। পরবর্তী শাসনকর্ত্তা সার রিভার টমসনের সময় ১৮৭৭ অব্দের ১লা এপ্রিল এই রেল গভর্ণমেণ্টের খাস অধীনে আসে এবং ইহার ইস্টারন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে নামকরণ হয়।

যেদিন প্রথম এই রেলপথে লৌহশকট চলিয়াছিল, সেদিন এক অদৃষ্টপূর্ব্ব ব্যাপার সংঘটিত হইয়াছিল। দলে দলে আবাল বৃদ্ধ বনিতা দুরান্তর হইতে আসিয়া লাইনের দুই ধারে শ্রেণীবদ্ধ হইয়া গাড়ির প্রত্যাশায় দাঁড়াইয়া থাকে এবং অনেকেই কিরূপে লৌহশকট অত লোক ও গাড়ী লইয়া অত দ্রুত আসিবে সে বিষয়ে বিলক্ষণ সন্দেহ প্রকাশ করিতে থাকে।

তাহাদের মধ্যে যাহারা পূর্ব্বেই, আই.আরের গাড়ী দেখিয়াছিল তাহারা অনেক বুঝাইলেও অন্যান্য সকলে কিছুতেই যতক্ষণ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ না করিয়াছিল ততক্ষণ এই অদৃষ্টপূর্ব্ব ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারে নাই! পরে যখন বংশীধ্বনি করিয়া প্রথম গাড়ী দেখা দিল- ঐ সমবেত সোৎসুক জনসমুদ্র বিশেষ কৌতুহলী হইয়া আনন্দ মিশ্রিত এক কোলাহল উত্থাপিত করিল এবং স্ত্রীলোকগণ কল্যাণ-সূচক হুলুধ্বনি দিতে লাগিল। এইরূপে ই.বি. লাইন প্রথম কৌতুহলী জনসঙ্গ কর্ত্তৃক সম্বর্দ্ধিত হইয়া দেশ মধ্যে ক্রমবিস্তার লাভ করিয়া আসিতেছে।

যখন প্রথম ই.বি. লাইন খোলা হয়, তখন গাড়ীতে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ এই চারি শ্রেণী বিদ্যমান ছিল। স্ত্রীলোকগণের নিমিত্ত স্বতন্ত্র গাড়ীর বন্দোবস্ত থাকিলেও সমৃদ্ধ ঘরের স্ত্রীলোকগণ সাধারণের সহিত তখন গাড়ীতে উঠিতেন না। তাঁহাদের পালকী, গাড়ীতে উঠাইয়া দেওয়া হইত। তখন নদীয়ার মধ্যে কাঁচড়াপাড়া, চাকদহ, রাণাঘাট, বগুলা, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া এই কয়টি স্টেশনে প্রধানত যাত্রী ও মাল যাতায়াত করিত।”

কলকাতা থেকে রানাঘাট, বাগুলা, বানপুর ও চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে পোড়াদহ হয়ে জগতি পর্যন্ত রেলপথে নিয়মিতভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয় ১৮৬৪ সালে। তবে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত রেল চলাচল শুরু হতে ১৮৭১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ওই পথে গোয়ালন্দ ঘাট থেকে ঢাকা পর্যন্ত EBR-এর রেলওয়ে স্টীমার সার্ভিসের মাধ্যমে ভারতবর্ষের তৎকালীন রাজধানী কলকাতাকে পূর্ববঙ্গের প্রধান শহর ঢাকার সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত করা হয়।

দেশভাগের পর ভারতীয় অংশের রেলপথটি ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে (ERR)-এর অধীনে চলে যায়, ১৯৫২ সালে যা ইস্টার্ন রেলওয়ে (ER) নাম পরিগ্রহণ করে। দেশভাগের পর ভারতীয় অংশে রেলওয়ের নাম পরিবর্তিত হলেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে EBR নামটি বহাল থাকে- যা ১৯৬১ সালে পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে (PER) নাম পরিগ্রহণ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ রেলওয়ে (BR) নামে পরিচিত হয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলেও কলকাতা থেকে পূর্ববঙ্গের মাঝে রেল চলাচল তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হয়নি। এই রেলপথে বর্তমান বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী দর্শনায় ১৮৬৮-১৮৬৯ সালে একটি রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়, শুরুতে যার নাম ছিল রামনগর। ১৯১০-এর দশকে স্টেশনটি এই নামেই পরিচিত ছিল। এরপর কোনো এক সময়ে (সম্ভবত দেশভাগের পরে) রামনগর রেলস্টেশনটি দর্শনা নাম পরিগ্রহণ করে। আর ভারতের গেদে রেলস্টেশনের প্রতিষ্ঠা হয় দেশভাগের পর সীমান্তে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস কার্যসমাধার প্রয়োজনে। তার আগে বানপুরই ছিল বর্তমান ভারত ভূখন্ডের শেষ স্টেশন। অর্থাৎ দর্শনায় রামনগর রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত ভারতের বানপুর ও বর্তমান বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গার মাঝে আর কোনো রেলস্টেশন ছিল না। সার্বিক বিবেচনায় ১৮৬২-১৮৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনটিই বর্তমান বাংলাদেশ ভূখন্ডের সর্বপ্রথম রেলস্টেশন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী বনগাঁ-রানাঘাট এবং রানাঘাট-দর্শনা রেলপথ ভারতের অংশে পড়ায় যশোর ও খুলনা জেলার সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই রেলপথের পুনঃসংযোগের জন্য ১৯৫১ সালের ২১ মার্চ দর্শনা থেকে সাবদালপুর পর্যন্ত ১১.৪ মাইল দীর্ঘ নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়।

বাংলাদেশ থেকে রেলপথে ভারতে যোগাযোগের জন্য দর্শনা রেলওয়ে টার্মিনাল হচ্ছে তোরণদ্বার। নিচের ছবিতে দর্শনা রেল ইয়ার্ড দেখা যাচ্ছে…



লাইক করুন