নিজস্ব প্রতিবেদক বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ কমাতে পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বুধবার রাজধানীর রমনায় কমিশনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেন। কমিশনের আদেশ অনুযায়ী, চলতি জুন মাসের বিল থেকেই নতুন দাম কার্যকর হবে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ১ টাকা ৫২ পয়সা এবং পাইকারি পর্যায়ে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের সঞ্চালন বা ট্রান্সমিশন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা। নতুন মূল্যহারে তা বেড়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা পর্যায়ে গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। সঞ্চালন হুইলিং চার্জও ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা করা হয়েছে।
কমিশন জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয় ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় এবং সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, পাইকারি মূল্য বৃদ্ধির পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
এর আগে গত ২০ ও ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিইআরসির গণশুনানিতে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি খুচরা পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ৮৫ পয়সা, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি ২ টাকা ৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল।
নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীর প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বেড়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা হয়েছে। ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ৮ টাকা ৫০ পয়সা, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ৭ টাকা ৫৯ পয়সা থেকে ৯ টাকা ১০ পয়সা, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ৮ টাকা ২ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৬২ পয়সা, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ১২ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ১৪ টাকা ৬১ পয়সা থেকে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী লাইফলাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। ০ থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য প্রায় ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সালের মার্চ মাসে লাইফলাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ছিল ২ টাকা ৫০ পয়সা, যা ২০২৬ সালের জুনে এসে ৫ টাকা ৩২ পয়সায় উন্নীত হয়েছে।
কৃষি খাতেও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। সেচ পাম্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পে ফ্ল্যাট রেটে প্রতি ইউনিট মূল্য ১০ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা করা হয়েছে। এছাড়া বাণিজ্যিক ও অফিস, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারি চার্জিং, শিক্ষা, ধর্মীয়, হাসপাতাল এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের দামও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন আয়ের ও কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর ওপর। তাঁর মতে, লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া ভর্তুকি কমিয়ে আনার ফলে তাদের বিদ্যুৎ বিল তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়বে। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলবে।
অধ্যাপক তামিমের মতে, শিল্প ও উৎপাদন খাত ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ভোজ্যতেল, প্লাস্টিক পণ্য ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। পাশাপাশি কৃষিতে সেচ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হবে। তিনি ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানো, খাতের অদক্ষতা দূর করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় কমাতে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও গৃহস্থালি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং এর চূড়ান্ত প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়বে। তাঁর মতে, এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, সিস্টেম লস ও ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপানো হয়েছে। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষ, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।