বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০৩:৩৩ অপরাহ্ন

৯ লাখ কোটির বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক দেশের অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও ঋণনির্ভরতার ক্রমবর্ধমান চাপে থাকার মধ্যেই আজ সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম এই বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা বেশি।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার ভিত্তি তৈরি করা হবে। তবে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণী মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই বাজেটের লক্ষ্যমাত্রাগুলো কতটা অর্জনযোগ্য।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রায় বড় ঝুঁকি

নতুন বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি। গত এক দশকে প্রায় প্রতিটি অর্থবছরেই সরকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থনীতি যখন চাপে থাকে তখন রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতাও সীমিত হয়ে যায়। শুধু লক্ষ্য বাড়িয়ে দিলেই রাজস্ব বাড়ে না। এর জন্য প্রয়োজন করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের সংস্কার এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা।

ইতিহাসের অন্যতম বড় বাজেট ঘাটতি

নতুন বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড়। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৭২ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে সরকারের বাড়তি ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের অর্থায়নের সুযোগ আরও সংকুচিত করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, রাজস্ব সংগ্রহে দুর্বলতা ও ঋণনির্ভর অর্থায়নের ফলে সরকার এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে নতুন ঋণ নিয়ে পুরনো দায় সামাল দিতে হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

সুদ পরিশোধে যাচ্ছে বাজেটের ১৪ শতাংশ

আগামী অর্থবছরে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ। মাত্র ছয় বছর আগেও এই ব্যয় ছিল প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা। স্বল্প সময়ে সুদ ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়াকে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য

সরকার আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬.৫ শতাংশ। অথচ চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৩.০৩ শতাংশে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

বিনিয়োগের হার জিডিপির ৩৪.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও গত পাঁচ বছরে তা ৩০ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১.০৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ কম।

ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য ইতিবাচক হলেও তা অর্জনের জন্য আস্থা পুনর্গঠন অপরিহার্য। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি দূর না করলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

মূল্যস্ফীতি এখনো দুই অঙ্কের কাছে

সরকার মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও গত মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের সর্বোচ্চ। এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে না রাখলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো সম্ভব হবে না। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

উন্নয়ন বাজেটেও প্রশ্ন

আগামী অর্থবছরে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে চলতি অর্থবছরে সংশোধিত এডিপি নেমে এসেছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় এবং বাস্তবায়ন হারও সন্তোষজনক নয়। নতুন এডিপির প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে, যার বড় অংশ প্রায়ই ব্যয় হয় না বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।

সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বেড়েছে

সব সমালোচনার মধ্যেও বাজেটের কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, চলচ্চিত্র, সংগীত ও ক্রীড়াভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতিকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনাও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাজেটের সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, উচ্চাভিলাষ না থাকলে উন্নয়নের দিকে যাওয়া যাবে না। বিগত দিনে দেশ যতটুকু পিছিয়েছে, সেখান থেকে সামনে যেতে হলে বিনিয়োগ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বড় বাজেট ঘোষণা করা সহজ হলেও সেই বাজেটের লক্ষ্য পূরণ করা অনেক বেশি কঠিন। রাজস্ব ঘাটতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, ঋণের চাপ ও প্রশাসনিক দুর্বলতা প্রায় প্রতিবছরই বাজেট বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে এই বাজেটের প্রকৃত পরীক্ষা হবে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই।



লাইক করুন