নিজস্ব প্রতিবেদক জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করছেন। এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক সরকারের প্রথম বাজেট। কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অধিবেশন আগামী ৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে এবং বাজেটের ওপর মোট ৪০ ঘণ্টা আলোচনা হবে।
দুই দশক পর বিএনপি সরকারের পক্ষে বাজেট উপস্থাপনের এই মুহূর্তটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করছে। সর্বশেষ ২০০৬ সালের জুনে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের পক্ষে জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন। এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সংসদ ছাড়াই উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছিল।
মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের স্থবিরতা এবং বিনিয়োগে চলমান মন্দার মধ্যে এই বিশাল বাজেট উপস্থাপিত হচ্ছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১১২ দিনের মাথায় চরম আর্থিক টানাপড়েন ও বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বাজেটটি ঘোষিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ
স্বাস্থ্য খাতে পরিচালন ও উন্নয়ন মিলিয়ে ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বিদায়ী অর্থবছরের ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার দ্বিগুণ। স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণে আলাদাভাবে আরও ৭ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে ৩৫ হাজার কোটি
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কমিশনের সুপারিশ ধাপে ধাপে বাস্তবায়নে আগামী অর্থবছরে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা কমিশন-সুপারিশকৃত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। বাকি ৫০ শতাংশ পরের অর্থবছরে এবং বিভিন্ন ভাতাসহ পূর্ণ সুবিধা ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে কার্যকর হবে। চলতি অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ রয়েছে ৮৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। নতুন কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হলে আগামী অর্থবছরে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হতো ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এ কারণে সরকার ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথ বেছে নিয়েছে।
করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি ও করসংস্কার
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে। পরের দুই বছর এই সীমা চার লাখ টাকায় বহাল রাখার ঘোষণাও থাকছে। বাজেট বক্তৃতায় ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমার একটি রূপরেখাও দেওয়া হচ্ছে। নারী করদাতা, ৬৫ বছরের বেশি বয়সি করদাতা, তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা, প্রতিবন্ধী করদাতা এবং গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আহত যোদ্ধা করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমাও বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের আয় করমুক্ত রাখার ঘোষণা আসছে এই বাজেটে। বিদেশ থেকে আসা এই আয়কে প্রবাসী আয়ের স্বীকৃতি দেওয়া হতে পারে, যার ফলে সংশ্লিষ্টরা প্রণোদনা সুবিধাও পাবেন। স্টার্টআপ, ইনোভেশন ভেঞ্চার ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কর অব্যাহতি সুবিধা বহাল থাকছে। আগামী অর্থবছর থেকে বছরজুড়েই আয়কর রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। বছরের শুরুতে রিটার্ন দিলে কর ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যাবে। দেরিতে রিটার্ন দিলে ৫ হাজার টাকা বা প্রদেয় করের ১০ শতাংশ জরিমানার বিধান রাখা হতে পারে। ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, তবে শিক্ষার্থী, সরকারি ভাতাভোগী ও পেনশন সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রে ছাড় থাকতে পারে।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও বিশাল ঘাটতি
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংক খাত থেকে এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা আদায়ের বিপরীতে ৬৯ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
দাম কমতে ও বাড়তে পারে যেসব পণ্যে
বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে বর্তমান ৯৩ শতাংশ শুল্ক-কর হার কমিয়ে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের গাড়িতে ৬৪ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের গাড়িতে ৮০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হতে পারে। এসি ও ফ্রিজের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত মুঠোফোনের ২২ ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। ক্যাশলেস লেনদেনে উৎসাহিত করতে পয়েন্ট অব সেল মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ কৃষি ও ভোগ্যপণ্যে উৎসে কর বিদ্যমান ১ থেকে ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হচ্ছে।
অন্যদিকে তামাকজাত পণ্যের মূল্যস্তর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব থাকছে। রডের ওপর ভ্যাট ১৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা এবং আমদানি করা কাজুবাদামের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে দশমিক ২০ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতি হাজারে দুই টাকা কর দিতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে বিশেষ সুবিধা
সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে উৎপাদন ও সরবরাহে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। মুঠোফোন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম ও সিসিটিভি ক্যামেরা দেশীয়ভাবে উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে। সেমিকন্ডাক্টর খাতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতি মিলবে ২০৩১ সাল পর্যন্ত এবং পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামালে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। নারী উদ্যোক্তাদের টার্নওভার করের ক্ষেত্রে করমুক্ত সীমা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হচ্ছে এবং দেশীয় কোম্পানির ভোজ্যতেল উৎপাদনে প্রথম ১০ বছর কর অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।
আগামী ১ জুলাই থেকে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।