বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:২৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
তাড়াশে নববুধসহ দু নারীর মৃত্যু অযত্ন-অবহেলায় ঝোপজঙ্গলে ঢেকেছে বেলকুচি টেলিফোন অফিস, পরিত্যক্ত ভবনে মাদকসেবনের অভিযোগ তাড়াশে এক ব্যক্তির বাধায় এডিপির অর্থায়নে গ্রামবাসীর একমাত্র চলাচলের রাস্তার কাজ বন্ধ চলাচলের রাস্তায় ঈদগাহ মাঠের প্রাচীর তাড়াশে অবরুদ্ধ ৪০টি পরিবার তাড়াশে গ্রাম্য বিরোধে একমাত্র রাস্তায় বেড়া দিয়ে অবরুদ্ধ দুটি পরিবার এনায়েতপুরে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা হাসমত উল্লাহর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন এনায়েতপুরে নারী হেল্প ডেক্স সেবা সম্পর্কে অবগত করন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা মূলক সভা অনুষ্ঠিত ‎ সলঙ্গায় চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ধরায় অপহরণের চেষ্টা, ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা বেলকুচিতে প্রভাব দেখিয়ে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা, আতঙ্কে বৃদ্ধ পরিবার  দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান, পাকা সড়কে স্বস্তি ফিরেছে এলাকাবাসীর

বিচারপতি ভি.আর. কৃষ্ণ আইয়ার: যিনি ন্যায়বিচারকে মানবিক করেছিলেন

১৯১৫ সালের ১৫ নভেম্বর কেরালায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর ৯৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘ এই জীবনে তিনি ছিলেন আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, আইন কমিশনের সদস্য এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে সবচেয়ে বেশি মনে রাখবে একটি কারণে— তিনি বিচারকের আসনকে জনগণের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।

১৯৭৩ সালে তিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৮০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। মাত্র সাত বছরের এই কার্যকালেই তিনি ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় এমন কিছু নীতির ভিত্তি স্থাপন করেন, যা আজও বিচারপ্রার্থীদের অধিকার রক্ষার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত।

প্রথমত, তিনি জামিনকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন বিচারিক সংস্কৃতিতে যা ছিল প্রায় বিদ্রোহী উচ্চারণ, তিনি তা রায়ে লিখলেন—

“Bail is the rule, jail is the exception.”

অর্থাৎ, জামিনই হবে নিয়ম, কারাবাস ব্যতিক্রম। বিচারের আগে দীর্ঘ কারাবাস যে এক ধরনের অঘোষিত শাস্তি, তিনি সেই সত্যকে বিচারনীতির অংশে পরিণত করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, তিনি আদালতের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেন। Public Interest Litigation (PIL) এবং epistolary jurisdiction-এর ধারণাকে কার্যকর রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ঐতিহাসিক। এক মামলায় কারাগার থেকে পাঠানো এক বন্দীর চিঠিকেই তিনি রিট পিটিশন হিসেবে গ্রহণ করেন। সেই রায়ে তিনি লিখেছিলেন—

“Freedom behind bars is part of our constitutional tryst.”

এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছিলেন, ন্যায়বিচার কেবল বিত্তবান ও ক্ষমতাবানদের জন্য নয়; দরিদ্র, অসহায় এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠও আদালতে সমান গুরুত্ব পেতে পারে।

তৃতীয়ত, তিনি আইনগত সহায়তাকে (Legal Aid) দাতব্য কার্যক্রম নয়, সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর বিচারিক দর্শনে স্পষ্ট ছিল— যেখানে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা ঝুঁকিতে, সেখানে বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা procedural justice-এর অপরিহার্য অংশ।

বিচারপতি কৃষ্ণ আইয়ার প্রায় ৭০০-এরও বেশি রায় প্রদান করেন, যেগুলোর প্রতিটিতেই মানবিক ন্যায়বোধের শক্তিশালী প্রতিফলন দেখা যায়। ভাষার উপর তাঁর অসাধারণ দখল তাঁর রায়গুলোকে শুধু আইনগত দলিল নয়, সাহিত্যিক মর্যাদাও দিয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন— বিচার হওয়া উচিত যান্ত্রিক নয়, মানবিক; আইনের অক্ষরের চেয়ে আইনের আত্মাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর জীবনের একটি ঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৪৮ সালে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় তিনি নিজেই মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন এবং এক মাস কারাভোগ করেন। যে মানুষ নিজে কারাগারের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, পরবর্তীতে তিনিই কারাবন্দীদের মর্যাদা ও মানবাধিকারের পক্ষে যুগান্তকারী রায় লিখেছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যখন বিচারিক দর্শনে রূপ নেয়, তখনই জন্ম হয় কৃষ্ণ আইয়ারের মতো বিচারকের।

বিচারব্যবস্থার প্রকৃত সংস্কার সবসময় প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকে না। অনেক সময় তা শুরু হয় একটি রায়ের ভাষায়, একটি নীতির সাহসী উচ্চারণে, জনগণের পক্ষে একটি নতুন পদক্ষেপ গ্রহনের মধ্য দিয়ে।

কলমেঃঃ

মো: জুনাইদ

সিনিয়র সিভিল জজ ও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার।



লাইক করুন